লেনিন ও কমিউনিস্ট পার্টি: বর্তমান প্রেক্ষাপট

লেনিন ও কমিউনিস্ট পার্টি: বর্তমান প্রেক্ষাপট

২০২৩ সালে কমিউনিস্ট পার্টি বৈশ্বিক ও জাতীয় স্তরে ১৭৬ বছর (১৮৪৭-২০২৩) অতিক্রম করেছে সেই সঙ্গে কমিউনিস্ট পার্টির তত্ত্ব ও প্রয়োগ বিকশিত হয়ে চলেছে। 

১৮৩৭ সালে উইলহেলম উইটলিং—প্যারিসে নির্বাসিত একজন জার্মান দরজি শ্রমিক ‘ন্যায়নিষ্ঠদের সমিতি’ (League of Just) প্রতিষ্ঠা করেন। বলা যেতে পারে, ঐতিহাসিক গুরুত্বের বিবেচনায় এটাই বীজ বপন। ১৮৩৪ সালে প্যারিসে গঠিত গুপ্ত সমিতি ‘নির্বাসিতদের লীগ’ থেকে বেরিয়ে আসা চরমপন্থীরা এটি গড়ে তোলেন। তিনি এটিকে আন্তর্জাতিক সংগঠনে রূপ দেন। এর সদস্য সংখ্যা ছিল প্রায় ১৩০০। ১ম আন্তর্জাতিক এর প্রথম দিককার বিবৃতিগুলোর তিনিও একজন স্বাক্ষরকারী ছিলেন। তিনি কাল্পনিক সমাজতন্ত্রী এবং বাইবেলের আলোকে সশস্ত্র চক্রান্তমূলক সংগ্রামের দ্বারা রাষ্ট্রকে উৎখাত করে সাম্যবাদ কায়েমে সচেষ্ট ছিলেন। শ্রমিকদের সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগাযোগের আগ্রহ থেকে মার্কস-এঙ্গেলস এই সংগঠনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হন। একে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের নীতির ভিত্তিতে পুনর্গঠনের প্রয়াস চালান। 

১৮৪৭ সালে ১ম কংগ্রেসে (লন্ডন) মার্কস-এঙ্গেলস ন্যায় নিষ্ঠদের লীগকে ষড়যন্ত্রমূলক রূপ থেকে মুক্ত করে নতুনভাবে পুনর্গঠন করেন এবং পুরোনো নাম বদলিয়ে এর নাম রাখা হয় কমিউনিস্ট লীগ। ১৮৪৮ সালে এই লীগের জন্য মার্কস-এঙ্গেলস কর্তৃক প্রণীত ইশতেহার পরে বিশ্বব্যাপী কমিউনিস্ট ইশতেহার নামে পরিচিতি লাভ করে। ১৮৪৭-১৮৫২—ছয় বছর স্থায়ী এই কমিউনিস্ট লীগই হলো কমিউনিস্ট কর্মসূচিভিত্তিকশ্রমিকশ্রেণির প্রথম আন্তর্জাতিক সংগঠন। কমিউনিস্ট লীগই মার্কস-এঙ্গেলস এর পার্টি সংক্রান্ত ভাবনার প্রথম সুস্পষ্ট প্রকাশ। এর ঘোষিত লক্ষ্য ছিল (১) বুর্জোয়া সমাজব্যবস্থার অবসান (২) সর্বহারা/ শ্রমিক শ্রেণির রাজত্ব কায়েম (৩) শ্রেণিহীন ও ব্যক্তিগত মালিকানাহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করা (৪) শ্রমিক শ্রেণির মুক্তি সাধন হলো শ্রমিক শ্রেণির নিজস্ব কর্তব্য। 

কমিউনিস্ট লীগ ছিল গণতান্ত্রিক, প্রতিনিধিত্বমূলক, অপসারণযোগ্য নেতৃত্ব বা পরিচালক দ্বারা গঠিত এবং সাধারণ শান্তিপূর্ণ সময়ে প্রচারমূলক সংস্থা। সেই সময়ে শ্রমিকদের মধ্যে সাম্যবাদী চেতনা সঞ্চারের উদ্দেশ্যে এ ধরনের সংগঠন গড়ে তোলা হয়। এটাই ছিল সাধারণ শান্তিপূর্ণ সময়ে মার্কস-এঙ্গেলস এর পার্টি গঠন ও কর্মপদ্ধতি সংক্রান্ত ভাবনা। কিন্তু পরবর্তীতে ইউরোপে বিশেষত ফ্রান্স ও জার্মানিতে শ্রমিক বিক্ষোভ-বিদ্রোহ রাজনৈতিক সংগ্রামের রূপ নেওয়ার পরিস্থিতি আর শান্তিপূর্ণ থাকে না। ফলে অবৈপ্লবিক পর্বের ‘বিশুদ্ধ প্রচারমূলক সংস্থা’ থেকে কমিউনিস্ট লীগকে বৈপ্লবিক ঝঞ্ঝারকালে ‘সর্বোচ্চ মাত্রার সাংগঠনিক বন্ধন, ঐক্য ও স্বাধীনতার’ ভিত্তিতে পুনর্গঠিত করা প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। মার্কস-এঙ্গেলস তখন কমিউনিস্ট লীগকে গোপন ও শক্তিশালী সংগঠনে পরিণত করার কথা বলেন। যা রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন মোকাবিলায় সক্ষম। কিন্তু এই নতুন পরিস্থিতি মোকাবিলা করে কমিউনিস্ট লীগ আর নতুনভাবে পুনর্গঠিত হতে পারেনি। ১৮৫২ সালে কমিউনিস্ট লীগকে আনুষ্ঠনিকভাবে ভেঙ্গে দেওয়া হয়। কারণ কতগুলো তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক প্রশ্নের মীমাংসা করা তখন সম্ভব হয়নি। 

পরবর্তীতে আবার ইউরোপে শ্রমিক আন্দোলনের জোয়ার এলে মার্কস-এঙ্গেলসের প্রেরণায় ১৮৬৪ সালে লন্ডনে গড়ে উঠে শ্রমিক শ্রেণির আন্তর্জাতিক সংগঠন-প্রথম আন্তর্জাতিক। এখানেই মার্কস শ্রমিক শ্রেণির পার্টি গঠনের মূলনীতি তুলে ধরেন: ‘মালিক শ্রেণির যৌথ ক্ষমতার বিরুদ্ধে পরিচালিত সংগ্রামে সর্বহারা শ্রেণি হিসেবে সক্রিয় হতে পারে শুধু তখনই যখন তারা নিজেদের এমন একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পার্টিতে সংগঠিত করে, যে পার্টি মালিক শ্রেণির দ্বারা গঠিত সমস্ত পুরোনো পার্টির বিরোধী। .... “সামাজিক বিপ্লব ও তার শেষ লক্ষ্য—শ্রেণির বিলোক সাধনকে জয়যুক্ত করতে হলে একটি রাজনৈতিক পার্টিতে সর্বহারা এই সংগঠন অপরিহার্য।” ১৮৭১ সালের প্যারিকমিউনের পতনের পর লন্ডন সম্মেলনে অনুরূপ ঘোষণা দেওয়া হয়। 

১ম আন্তর্জাতিক টিকে ছিল ১৩ বছর (১৮৬৪-৭৬১)। প্যারিকমিউনের পতনের পর ইউরোপে শ্রমিক আন্দোলন সাময়িক হতাশা ও বিভেদের প্রেক্ষাপটে ১৮৭৬ সালে তা ভেঙ্গে দেওয়া হয়। মার্কস-এঙ্গেলস আন্তর্জাতিক শ্রমিক আন্দোলনের সামনে কমিউনিস্ট পার্টির প্রয়োজনীয়তা সহ একটি সংক্ষিপ্ত রূপরেখা হাজির করেছিলেন কিন্তু কীভাবে তা গড়ে উঠবে সেটা সূত্রায়িত করে যেতে তা পারেন নি। তবে প্রথম আন্তর্জাতিকের প্রভাবে এ সময়কালে বিভিন্ন দেশে গড়ে ওঠে সোস্যালিস্ট/সোস্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। প্রথম পার্টি গঠিত হয় জার্মানিতে ১৮৬৯ সালে। এরপর হল্যান্ডে (১৮৭০), ডেনমার্কে (১৮৭১), বোহেমিয়ায় (১৮৭২), মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে (১৮৭৬), ফ্রান্স ও স্পেনে (১৮৭৯), ইংল্যান্ডে (১৮৮০), রাশিয়ায় শ্রমিক মুক্তি সংঘ (১৮৮৩), নরওয়েতে (১৮৮৭), সুইডেন, অস্ট্রিয়া ও সুইজারল্যান্ডে (১৮৮৯) পার্টি গড়ে ওঠে। 

১৮৮৩ সালে মার্কসের মৃত্যু হলে এর ৬ বছর পর ১৮৮৯ সালে এঙ্গেলসের নেতৃত্বে ২য় আন্তর্জাতিক গঠিত হয়। কিন্তু ১৮৯৫ সালে তার মৃত্যুর পর সুবিধাবাদী নেতৃত্ব মার্কসবাদের মূলনীতিকে বর্জন করে। শ্রমিক শ্রেণির আদর্শের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করে নিজ নিজ দেশের সাম্রাজ্যবাদী সরকারের যুদ্ধের পক্ষে সমর্থন জানায়। ২৫ বছর পর (১৮৮৯-১৯১৪) এই আন্তর্জাতিকের অবসান ঘটে ১৯১৪ সালে। ১৯১৯ সালে লেনিনের উদ্যোগে আবির্ভাব ঘটে ৩য় আন্তর্জাতিকের। এই আন্তর্জাতিকের ১৯২১ সালে অনুষ্ঠিত ৩য় কংগ্রেসে মার্কস-এঙ্গেলসের দিশায় লেনিন দেশে দেশে কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তোলার মূলনীতি (পার্টি সংগঠনের মূলনীতি) তুলে ধরেন—যা আজও অনুসরণযোগ্য। 

বিভিন্ন লেখায় লেনিনের পার্টি সংক্রান্ত ধারণার প্রকাশ ও তার প্রয়োগ কতটা তৎকালীন রাশিয়ার পরিস্থিতির সঙ্গে করে যুক্ত আর কতটা সার্বজনীন তা বিবেচনাযোগ্য। কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তোলার সাধারণ তত্ত্বায়ন এবং একটি নির্দিষ্ট দেশে ও কালে তার রূপটি কী হবে তার সমাধান লেনিনের কেন্দ্রীয় অবদান—একটি সার্বজনীন অন্যটি বিশেষ। 

লেনিন এবং পার্টি

বলশেভিক পার্টির নেতৃত্বে সংঘটিত রুশ বিপ্লবের মাধ্যমে শ্রমজীবী জনগণের ক্ষমতা দখল একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। আর এই সফলতা লেনিনের বিপ্লবী পার্টি সংক্রান্ত তত্ত্ব ও প্রয়োগকে আজও অম্লান করে রেখেছে। সেই সঙ্গে এ নিয়ে কৌতুহল, বিশ্লেষণ, অধ্যয়ন, গবেষণা এবং তর্ক-বিতর্কও নানা তরফে অব্যাহত রয়েছে। 

তৎকালীন রাশিয়ায় পার্টি গড়ার প্রথম প্রয়াস আমরা দেখতে পাই জেনেভায় নির্বাসিত প্লেখানভ কর্তৃক ‘শ্রমিক শক্তি সংঘ’ প্রতিষ্ঠার মধ্যে। ১৮৮৩ সালে এটি গড়ে ওঠে এবং রাশিয়ার মার্কসবাদ প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। 

১৮৭০ সালে জন্ম নেওয়া লেনিন ১৮৮৭ সালে ১৭ বছর বয়সে কাজান বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে বিপ্লবী ছাত্র আন্দোলনে যুক্ত থাকার জন্য বহিষ্কৃত হন এবং সেখানে একটি মার্কসবাদী গ্রুপে যোগ দেন। পরবর্তীতে তিনি সামারা শহরে একটি মার্কসবাদী গ্রুপ গড়ে তোলেন এবং ১৮৯৩ সালে সেই পিটার্সবুগে এসে তিনি সেখানকার মার্কসবাদী পাঠচক্রগুলোতে অংশ নেন। এ সময়ে মার্কসবাদ সংক্রান্ত তার গভীর জ্ঞান, সাংগঠনিক ক্ষমতা, আদর্শগত দৃঢ়তা এবং শ্রমিক শ্রেণির বিজয়ে অবিচল আস্থা-তাকে দ্রুত সেখানকার নেতায় পরিণত করে। 

সেন্ট পিটার্সবুর্গের প্রায় ২০টি মার্কসবাদী চক্রকে একত্রিত করে ১৮৯৫ সালে লেনিন ‘শ্রমিকশ্রেণির মুক্তি সংগ্রাম সংঘ’ গড়ে তোলেন। এটিই ছিল লেনিনের বিপ্লবী পার্টি গঠনের সূত্রপাত, লেনিন একে রাশিয়ার শ্রমিক শ্রেণির পার্টির ভ্রুণ বলে অভিহিত করেছিলেন, যে অভিজ্ঞতা পরে বলশেভিক পার্টি গড়ে তোলার কাজে লাগে। এ সময় তিনি চলমান শ্রমিক শ্রেণির আন্দোলনের সঙ্গে নানাভাবে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপন করেন। সেই সঙ্গে নানা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ এবং তাদের বিভ্রান্তি-বিচ্যুতির বিরুদ্ধে তত্ত্বগত ও মতাদর্শিক লড়াই চালান। 

১৮৯৮ সালে শ্রমিক শ্রেণির মুক্তি সংগ্রাম সংঘের বিভিন্ন অঞ্চলের গ্রুপগুলোকে একত্রিত করে পার্টি গঠনের লক্ষ্যে প্রথম কংগ্রেস ডাকা হয়। লেনিন সাইবেরিয়ায় নির্বাসনে থাকায় মাত্র ৯ জনের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত এই কংগ্রেসে কিছুটা অগ্রগতি হলেও কাঙ্ক্ষিত বিপ্লবী পার্টি তখনও তা হয়ে ওঠেনি। এই কংগ্রেস থেকে রুশ সোস্যাল ডেমোক্র্যাটিক লেবার পার্টি (RSDLP) গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়। কিন্তু পার্টির গঠনের প্রশ্নে নানা বিভ্রান্তি ও মতাদর্শিক বিরোধীতা বিশেষত অর্থনীতিবাদীদের তরফ থেকে—বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। আর এইসব বাধা-বিপত্তি সরিয়ে পার্টি গঠনের পথ সুগম করতে লেনিন ‘ইস্ক্রা’ পত্রিকা প্রকাশের উদ্যোগ নিলেন ১৯০০ সালের ডিসেম্বরে। এই পত্রিকাতেই লেনিন পার্টি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রধান সমস্যা ও প্রশ্নগুলোকে তুলে ধরেন। কেবল যৌথ প্রচারক ও আন্দোলকই নয়, সেই সঙ্গে যৌথ সংগঠকরূপে পত্রিকাকে কাজে লাগিয়ে লেনিন বিপ্লবী পার্টি গঠনের গুরু দায়িত্ব পালনে আত্মনিয়োগ করলেন। শুধু তাই নয়, লেনিন পার্টি গড়ে তোলার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনাও তুলে ধরলেন। অবশেষে ১৯০৩ সালে রুশ সোস্যাল ডেমোক্র্যাটিক লেবার পার্টির ২য় কংগ্রেসে (বিদেশে ও গোপনে) লেনিনের পার্টি সংক্রান্ত তত্ত্বায়নের ভিত্তিতে একটি যথার্থ বিপ্লবী পার্টি গঠনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। তুমুল তর্ক- বিতর্কের মাধ্যমে লেনিনপন্থীরা অধিকাংশ ভোটে বিজয়ী হওয়ায় তারা হন ‘বলশেভিক’ (অর্থাৎ অধিকাংশ), আর পরাজিত বিরোধী পক্ষ ‘মেনশেভিক’ (সংখ্যায় কম) নামে পরিচিত লাভ করেন। ফলে পার্টিতে এই দুই নামে দুই গ্রুপের উদ্ভব ঘটে। এই কংগ্রেসেই পার্টির কর্মসূচি, নিয়মাবলী গৃহীত হওয়ার পাশাপাশি কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে কার্যকরি করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। ১৯০১-১৯০৫ এই সময়কালেই লেনিন তার পার্টি সংক্রান্ত মূল তত্ত্বায়ন সম্পন্ন করেন। 

লেনিনের পার্টি সংক্রান্ত তত্ত্বের মূল দিক 

  1. পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে শ্রমিক শ্রেণির স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন কমিউনিস্টদের ভূমিকা ব্যতিরেকে আপনাআপনি সমাজ বিপ্লব/সাম্যবাদে উন্নীত হতে পারে না। বড় জোর তা ট্রেড ইউনিয়ন স্তরে উত্তরণ ঘটতে পারে। তাই স্বতঃস্ফূর্ত শ্রমিক শ্রেণির আন্দোলনে সমাজ বদলের বিপ্লবী চেতনা বা সমাজতান্ত্রিক চেতনা বাইরে থেকে সঞ্চারিত করতে হয়—যার দায়িত্ব কমিউনিস্ট বা বিপ্লবী সংগঠক বা নেতৃত্বের। এর কারণ শ্রমিক শ্রেণির অক্ষমতা বা অযোগ্যতা নয়। বরং সব ধরনের সম্পদের বৈষম্যমূলক বণ্টনের ফলে তারা কেবল ধনের গরিব নয়, জ্ঞানেরও গরিব হয়ে পড়ে, জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবার ফলে। 
  2. ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে সংগঠন ছাড়া শ্রমিক শ্রেণির আর কোনো অস্ত্র নেই। 
  3. কমিউনিস্ট পার্টি হলো সমগ্র শ্রমিক শ্রেণির অগ্রবাহিনী, যারা সংগঠিত ও সুশৃংখল। সেই সঙ্গে যে পার্টি সবচেয়ে অগ্রসর তত্ত্ব দ্বারা পরিচালিত একমাত্র তার পক্ষেই অগ্রবাহিনীর ভূমিকা পালন করা সম্ভব। পার্টিকে কোনক্রমেই সমগ্র শ্রেণির সাথে এক করে দেখা উচিত নয়। 
  4. কমিউনিস্ট পার্টি হলো শ্রেণি সংগঠনের শ্রেষ্ঠ রূপ হিসেবে শ্রমিক শ্রেণির রাজনৈতিক সংগঠন এবং একাধিপত্য প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার। 
  5. পার্টি হবে বহু সংগঠনের যোগফল, কেবল পার্টি গণিতের যোগফল নয়—একটি জটিল ব্যাপার। শ্রেণির অগ্রবাহিনী হিসাবে যতদূর সম্ভব বেশি মাত্রায় সংগঠিত হতে হবে এবং পার্টি তার বাহিনীতে শুধু এমন সব উপাদান সংগ্রহ করবে, যাদের মধ্যে অন্ততঃ নিম্নতম মাত্রার সংগঠন গড়া সম্ভব। কেবলমাত্র বিপ্লবীদের সংগঠনইশ্রমিকশ্রেণির পার্টির সক্রিয় উপাদান হবে না, পার্টি সংগঠনশ্রমিকশ্রেণির বহুবিধ সংগঠনের সবগুলোই তার সক্রিয় উপাদান হবে। 
  6. কমিউনিস্ট পার্টির চূড়ান্ত লক্ষ্য সমাজতন্ত্র-সাম্যবাদ, শ্রেণি ভিত্তি—শ্রমিক-মেহনতি জনগণ এবং মতাদর্শগত ভিত্তি—মার্কসবাদ তথা দ্বান্দ্বিক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদ। 
  7. পার্টির সদস্য হবে সেই—যে পার্টির কর্মসূচি মেনে নেবে, পার্টিকে অর্থ দিয়ে সাহায্য করবে এবং পার্টির কোনো না কোনো সংগঠনের সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে। 
  8. পার্টির দুটি অংশ থাকবে: (ক) পার্টির নেতৃস্থানীয় কর্মীদের নিয়ে একটি ঘনিষ্ঠ চক্র—এখানে প্রধানত সে ধরনের কর্মীরা থাকবেন যারা পেশাদার বিপ্লবী অর্থাৎ এমন পার্টি কর্মী যারা পার্টির কাজ ছাড়া আর কিছুই করেন না। এদের যতটুকু থাকা দরকার অন্ততঃ ততটুকু মার্কসবাদী জ্ঞান, রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, সংগঠনের অভ্যাস—তা রয়েছে এবং পুলিশকে মোকাবিলা করার সক্ষমতা আছে। (খ) স্থানীয় পার্টি সংগঠনগুলোর সুবিস্তৃত জাল এবং বহুসংখ্যক এমন পার্টি সভ্য যারা লক্ষ লক্ষ মেহনতি জনগণের সহানুভূতি ও সমর্থন ভোগ করেন। 
  9. পার্টির কর্মসূচির দুটি ভাগ থাকবে: (১) সর্বাধিক কর্মসূচি—সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব, পুঁজিবাদের উচ্ছেদ ও সর্বহারার একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠা (২) সর্বনিম্ন কর্মসূচি—সর্বাধিক কর্মসূচি বাস্তবায়নের ক্ষেত্র তৈরি বা পূর্ব প্রস্তুতি স্বরূপ আশু কর্তব্য/উদ্দেশ্য সফল করা। যেমন—গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম, স্বৈরাচারের উচ্ছেদ, ভূমি সংস্কার, শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি, সামন্ততন্ত্রের অবশেষ বিলোপ ইত্যাদি। 
  10. লক্ষ লক্ষ সাধারণ শ্রমিকদের সাথে শ্রমিক শ্রেণির অগ্রবাহিনীর যে সম্পর্ক তার বাস্তব রূপ হলো পার্টি। অগ্রণী হিসাবে পার্টি যতই চমৎকার হোক না কেন, তার সংগঠন যতই ভাল হোক না কেন, পার্টির বাইরের ব্যাপক শ্রমজীবী জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক না থাকলে এবং এই সম্পর্ককে ক্রমাগত বহুগুণ বাড়াতে ও শক্তিশালী না করলে পার্টি বাঁচতে বা বাড়তে পারে না। পার্টি নিজের খোলের মধ্যে শামুকের মতো গুটিয়ে গেলে ব্যাপক শ্রমিকদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, নিজ শ্রেণির সঙ্গে সংযোগ হারিয়ে ফেলে এবং অধিকাংশ মেহনতির বিশ্বাস ও সমর্থন হারিয়ে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যায়। 
  11. ঠিক মতো কাজ করতে হলে এবং অধিকাংশকে যথারীতি পরিচালিত করতে হলে পার্টিকে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ভিত্তিতে দাঁড় করাতে হবে। একই নিয়ম কানুন ও একই পার্টি শৃঙ্খলা থাকবে। পার্টি কংগ্রেস হবে একমাত্র নেতৃত্বকারী প্রতিষ্ঠান এবং দুই কংগ্রেসের মধ্যবর্তীকালে নেতৃত্বভার থাকবে কেন্দ্রীয় কমিটির উপর। যারা সংখ্যায় কম, তারা অধিকাংশের মত মেনে নেবে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রের নির্দেশ মতো চলবে, নিম্নতর প্রতিষ্ঠানুলি উচ্চতর প্রতিষ্ঠানকে মানবে। 
  12. নিয়মিত কাজকর্মে সব সদস্যের ঐক্য বজায় রাখতে হলে—পার্টিকে অবশ্যই সবার জন্য শ্রমিক শ্রেণির কঠোর শৃঙ্খলা প্রয়োগ করতে হবে। পার্টি নেতা এবং সাধারণ সদস্য—উভয়ের ওপর সমানভাবে এই শৃঙ্খলা প্রয়োগ করতে হবে। পার্টির মধ্যে ‘বাছাবাছা কয়েকজন’ যাদের ওপর শৃঙ্খলা খাটে না এবং ‘আর সকলে’ যারা শৃঙ্খলা মেনে থাকেন—এমন পার্থক্য থাকা চলবে না। এই শর্ত পালিত না হলে পার্টির অখণ্ডতা এবং পার্টির সদস্যদের ঐক্য বজায় রাখা যাবে না। 
  13. গণতান্ত্রিক কেন্দ্রীকতা—গণতন্ত্র এবং কেন্দ্রীকতার ভিত্তিতে পরিচালিত হবে পার্টি। সব সিদ্ধান্ত গণতান্ত্রিকভাবে গৃহীত হয়ে কেন্দ্রীকতার ভিত্তিতে বাস্তবায়ন হবে। 
  14. আন্তঃপার্টি গণতন্ত্র ও সমালোচনা-আত্মসমালোচনা।
  15. লেনিন তৎকালীন রাশিয়ায় যে আর্থ-সামাজিক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছিলেন সেই পরিপ্রেক্ষিত অনুযায়ী তিনি পার্টি নির্মাণের তত্ত্বায়ন ও তা প্রয়োগ করেছিলেন। কখনো সে পরিস্থিতি ছিল স্বৈরাচারী ও অগণতান্ত্রিক আবার কখনো ছিল মুক্ত গণতান্ত্রিক। তাই এই বৈচিত্র্যতায় পার্টির রূপ কী হবে—গোপন, অতিকেন্দ্রীভূত, সংকুচিত না কি প্রকাশ্য, গণতান্ত্রিক ও প্রসারিত—তা অনেকাংশে সেই সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল ছিল। 

লেনিন উত্তর পার্টি

লেনিনের পরবর্তীকালে পার্টি সংক্রান্ত তত্ত্বের ভান্ডারে আমরা আজ অবধি মৌলিকভাবে নতুন কিছু সংযুক্ত হতে দেখিনা। ট্রটস্কি মোটামুটি লেনিনের পার্টি তত্ত্ব কাঠামোর মধ্যে থেকেই কখনো লেনিনের পক্ষে কখনো লেনিনের বিপক্ষে তৎপর থেকেছেন এবং লেনিনের মৃত্যুর পর পার্টি সংগঠন প্রশ্নে স্তালিনের বিরোধিতায় লিপ্ত হয়েছেন। লেনিনের একনিষ্ঠ অনুসারী হিসেবে স্তালিন লেনিনের পার্টি সংক্রান্ত ধারণাগুলোকে সংকলিত করে তুলে ধরেন। অন্যদিকে সেই সময়ে চেক মার্কসবাদী তাত্ত্বিক গেওর্গি লুকাচ অন্যান্য কিছু বিষয়ে মাঝেমধ্যে বিরোধিতা করলেও লেনিনের পার্টি তত্ত্বকেই মেনে নিয়েছিলেন। এক্ষেত্রে তিনি লেনিনকে ‘প্রয়োগের তত্ত্ববিদ’ রূপে অভিহিত করেছেন। সেই সঙ্গে লেনিন কীভাবে প্রয়োগমুখী জ্ঞান তত্ত্বের আলোকে বৈচিত্র্যপূর্ণ সামগ্রিকতার মধ্যে পার্টি গড়ে তুলেছিলেন সে বিষয়টি তুলে ধরেছেন। এ প্রসঙ্গে তার একটি বক্তব্য উল্লেখযোগ্য “লেনিন এবং অল্প যে কয়েকজন বিপ্লবের বাস্তবতা ঘোষণা করেছিলেন, ইতিহাস তাকে ন্যায়সংগত বলে প্রমাণ করেছে।” বিখ্যাত ফরাসি মার্কসবাদী তাত্ত্বিক লুই আলথুজারও পার্টি প্রশ্নে লেনিনের এই জ্ঞানতাত্ত্বিক অবস্থানকে স্বীকৃতি দিয়েছেন। 

তবে পার্টি প্রশ্নে লেনিনের চিন্তা-তৎপরতা-সমালোচনামূলক বিকল্প ভাবনা আসে রোজা লুক্সেমবুর্গের কাছ থেকে। তিনি ছিলেন কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের বিপ্লবী নেত্রী, লেনিনের সহযোদ্ধা এবং জার্মান কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। রোজার অভিযোগটি ছিল “লেনিনের পার্টি সংক্রান্ত ধারনায় কেন্দ্রীকতার ওপর অতিরিক্ত গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। লেনিন সর্বোচ্চ কেন্দ্রীকতার মাধ্যমে পার্টি কেন্দ্রের হাতে সমস্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করতে চান এবং এর ফলে সমাজের বিপ্লবী পরিস্থিতি থেকে বিপ্লবীদের কেন্দ্র বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। অতিকেন্দ্রীকতা ও বিপ্লবের জন্য খুঁটিনাটি পরিকল্পনা জনগনের স্বতঃস্ফূর্ত ভূমিকাকে নাকচ করবে।” তাই রোজার মতে পার্টির নিখুঁত পরিকল্পনার প্রয়োজন নেই। পার্টি কেবল সমাজ বিকাশের ধারায় কেন সমাজতন্ত্র অনিবার্য—সেই চেতনা শ্রমিক শ্রেণির মধ্যে সঞ্চারিত করবে। আর বিপ্লবের চালিকা শক্তি হবে জনগনের স্বতঃস্ফূর্ত উদ্যোগ। এই ভাবে শ্রমিক শ্রেণির চেতনা সঠিকভাবে বিকশিত হয়ে তাদেরকে সমাজের পরিচারক ও প্রশাসক করে তুলবে। তবে রোজা তার এই সমালোচনামূলক ভাবনা বাস্তবায়নের কোন দিশা দিতে পারেননি। শেষ জীবনে মৃত্যুর আগে আগে তিনি এ ধারণা থেকে অনেকখানি সরে আসেন এবং লেনিনের পার্টি সূত্রায়নকে মোটা দাগে মান্যতা দেন। 

আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের অন্যতম সংগ্রামী তাত্ত্বিক ও ইতালির কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা বিপ্লবী নেতা আন্তোনিও গ্রামসি পরিবর্তিত নতুন পরিস্থিতির বাস্তবতায় লেনিনীয় পার্টির তত্ত্ব কাঠামো আরও সমৃদ্ধ করেছেন। তিনি রুশ বিপ্লবকে মার্কসের ‘দাস ক্যাপিটাল’-এর বিরুদ্ধে বিপ্লব অভিহিত করে অভিনন্দন জানিয়েছেন। সমাজ বিপ্লবের বস্তুগত শর্ত না বিকশিত হওয়া সত্ত্বেও চৈতন্যগত পরিপক্বতাকে কাজে লাগিয়ে বিপ্লব ত্বরান্বিত করার জন্য লেনিনের বলশেভিক পার্টিকে প্রশংসা করেছেন। পার্টি প্রশ্নে গ্রামসি ইতালীয় রেঁনেসাঁর রাজনৈতিক তাত্ত্বিক ম্যাকিয়াভেলির লেখা ‘দ্য প্রিন্স’কে পাঠ ও উপস্থাপন করলেন নতুন প্রেক্ষাপটে। ম্যাকিয়াভেলি তাঁর ঐ লেখায় সে সময়ে একটি নতুন রাষ্ট্র গড়ার ক্ষেত্রে ইতালির জনগণের জাতীয় সমষ্টিগত আকাঙ্ক্ষাকে একজন কল্পিত রাজপুত্রের (The Prince) নেতৃত্বের মাধ্যমে মূর্ত করে তুলেছিলেন। গ্রামসির ভাষ্যে শ্রমিকরাজ কায়েমের জন্য তেমনি এক রাজনৈতিক নেতৃত্ব রূপে আধুনিক রাজপুত্র তথা ‘মডার্নপ্রিন্স’ হল কমিউনিস্ট পার্টি। এই মডার্ন প্রিন্স কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি নন। বরং এটা কেবলমাত্র হতে পারে একটি সংগঠন—সমাজের একটি জটিল উপাদান যেখানে সম্মিলিত আকাঙ্ক্ষা যা ইতোমধ্যে স্বীকৃতি পেয়েছে এবং কিছুটা কর্মে পরিণত করেছে, নির্দিষ্ট রূপ নিয়েছে। আর ইতহাসে তো এই অংকুর এখন দেখাই যাচ্ছে এবং এটা হল রাজনৈতিক দল—প্রথম অনুকোষ যেখানে সম্মিলিত আকাঙ্ক্ষার পরমাণুগুলো পরস্পরের কাছে এসে সার্বজনীন ও সমগ্রতায় রূপ নেয়। (Prison Note Book: A. Gramsci)। আর এক্ষেত্রে গ্রামসি বল প্রয়োগ/ আধিপত্য/ কর্তৃত্ব এবং সম্মতি—এই দ্বৈত প্রেক্ষাপটকে (অর্থাৎ রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান তথা রাষ্ট্রের মাধ্যমে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা ও সুশীল সমাজকে জয় করার দ্বারা সম্মতি আদায়) তুলে ধরেন। সেই সঙ্গে ক্ষমতার প্রশ্নে—তাৎক্ষনিক সাময়িক বা ক্ষণস্থায়ী বিজয়ের জন্য রণকৌশল ভিত্তিক যুদ্ধ (War of Maneuver) এবং স্থায়ী দীর্ঘমেয়াদী বিজয়ের লক্ষ্যে রণনীতিগত যুদ্ধের (War of Position) প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। 

গ্রামসির পার্টি সংক্রান্ত ভাবনার আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল—স্বতঃস্ফূর্ত ও সচেতন নেতৃত্বের ধারণা যা আসলে পার্টি এবং শ্রেণির আন্তঃসম্পর্কের সমতূল্য। এই জটিলতাকে লেনিন, রোজা বা লুকাচ আগেই উপলব্ধি করেছিলেন। গ্রামসির মতে বিশুদ্ধ ‘স্বতস্ফূর্ততা’ বা বিশুদ্ধ ‘সচেতনতা’ বলে কিছু নেই। অনুসন্ধান করে দেখা না হলেও প্রত্যেক স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনের মধ্যেও যেমন সচেতন নেতৃত্বের উপাদান থাকে। বিপরীতে সব সচেতন তৎপরতার মধ্যে স্বতঃস্ফূর্ততার সংমিশ্রণ থাকে। তাই ‘স্বতস্ফূর্ততা’ এবং ‘সচেতনতা’ পরস্পর সাংঘর্ষিক বা বিপরীত নয় বরং একের অন্যটিতে উত্তরণযোগ্য। গ্রামসির পর্যবেক্ষণে পার্টিকে অভ্যাস বা গতানুগতিকতার দাস হলে চলবে না। পার্টিকে গড়ে তোলা হয় সংকট মোকাবেলায় প্রস্তুত থাকতে, ঐতিহাসিক ক্রান্তিলগ্নে ভূমিকা রাখতে। কিন্ত দেখা যায় এরকম সময়েও পার্টি গৎবাঁধা রুটিন কাজে লিপ্ত রয়েছে এবং সময়ের দাবি অনুযায়ী নতুন কর্তব্য পালনে অক্ষম হয়ে পড়ছে। এর মূল কারণ—গ্রামসির মতে পার্টি আমলাতন্ত্র, যা পার্টিকে ব্যাপক কর্মী বাহিনী থেকে বিচ্ছিন্ন করে এবং তা সেকেলে হয়ে পরে। তাই এসব সমস্যা মোকাবেলায় গ্রামসির প্রস্তাবনা হল—পার্টি ও শ্রেণির, নেতা ও কর্মীর, শৃঙ্খলা ও উদ্যোগের, স্বতঃস্ফূর্ততা ও সচেতনতার, ধারাবাহিকতা ও তার ছেদ ঘটিয়ে পরিবর্তন—এদের মধ্যে দ্বান্দ্বিক ঐক্য গড়ে তোলা। গ্রামসির বিচারে পার্টি হবে গণভিত্তি সম্পন্ন, ব্যাপক শ্রমজীবিদের সঙ্গে নানা ভাবে সম্পৃক্ত, যেটা ছাড়া নিজস্ব (organic) বুদ্ধিজীবিদের দ্বারা সর্বহারার আধিপত্যও কায়েম করা সম্ভব হবে না। উল্লেখ্য যে, গ্রামসির নেতৃত্বাধীন পার্টিতে সদস্য সংখ্যা ৪০ হাজার উন্নীত হয়েছিল, যাদের ৯৮ ভাগ শ্রমজীবি এবং ০.৫ ভাগের কম (সর্বমোট ২৪৫ জন) ছিল বুদ্ধিজীবি। আসলে লেনিনের পার্টি সংক্রান্ত ধারণাকে সৃজনশীলভাবে সংবর্ধিত করতে চেয়েছেন। আর সেটা হল—অতীত থেকে প্রাপ্ত আর বর্তমানে বহাল থাকা বস্তুগত আর্থ-সামাজিক বাস্তবতার মধ্যেই ভবিষ্যত সম্ভাবনা দেখতে পাওয়া। বিপ্লবী তত্ত্বে সজ্জিত বিপ্লবী পার্টির মাধ্যমে মানুষের চেতনা ও তৎপরতা দ্বারা বস্তুগত অবস্থাকে বদলানো। 

গ্রামসির মতে গণতান্ত্রিক কেন্দ্রীকতার মধ্যেই কেবল স্বতঃস্ফূর্ত উদ্যোগের সঙ্গে সচেতন বিপ্লবী পার্টির আন্তঃক্রিয়া দেখা যায়। এ হল আন্দোলনের মধ্যে ‘কেন্দ্রীকতা’—অর্থাৎ সত্যিকার সংগ্রামের পার্টির অব্যাহত নিজেকে খাপ খাওয়ানো, উপরের নির্দেশের সঙ্গে তলার চাপের সামঞ্জস্য বিধান করা, সর্বস্তরের কর্মীদের মধ্য থেকে উঠে আসা বিষয়গুলো নেতৃত্ব কাঠামোর মধ্যে অনুপ্রবেশ ঘটানো—যা কিনা লাগাতার অভিজ্ঞতার সঞ্চয়কে নিশ্চিত রাখে। 

গ্রামসির প্রস্তাবনা হলো, স্বতঃস্ফূর্ততার উপাদানকে অবহেলা ও তাচ্ছিল্য না করে শিক্ষিত ও সঠিক ধারায় প্রবাহিত করে বাইরের দূষণ থেকে পরিশুদ্ধের মাধ্যমে বিপ্লবী তত্ত্বের দিকে নিয়ে আসা—একটি সজীব ও ঐতিহাসিকভাবে কার্যকর উপায়ে। স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সচেতন নেতৃত্বের মধ্যে ঐক্য হল শ্রমজীবীদের আসল রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, যা কখনোই জনগণকে প্রতিনিধিত্ব করার দাবিদার কিছু গোষ্ঠীর অভিযান নয়। একটি সজীব প্রাণী যেভাবে বাঁচে, পার্টিও তেমনভাবে জৈবিকভাবে তার (organically) তার কর্মকাণ্ড চালাবে—আমলাতান্ত্রিকভাবে নয়।

গ্রামসির পার্টি হল এককাট্টাভাবে সংগঠিত কিন্ত খুব নমনীয় গণযুদ্ধের সংগঠন যা জনগণের মধ্যে প্রবিষ্ট অগ্রবাহিনীর পার্টি, সংগ্রামকে যা উদ্দীপ্ত করবে, জনগণকে শ্রেণিচেতনায় আন্দোলিত করবে, সমালোচনাধর্মী সক্রিয় চেতনার কেন্দ্রীয় বাহক হবে। পার্টির ভূমিকা হল নির্দেশনামূলক ও সমন্বয়মূলক—যা কিনা বিপ্লবী কর্মতৎপরতার শিক্ষা পদ্ধতি। আর পার্টির এই অগ্রবাহিনীর ভূমিকার অর্থ হল—মতাদর্শগত ও সাংগঠনিক নেতৃত্বদান, কখনোই আন্দোলনের মধ্যে ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া বহিঃস্থ পরজীবি হয়ে ওঠা নয়। 

গ্রামসি পার্টিতে তিন ধরনের স্তরের কথা বলেছেন—(ক) সাধারণ মামুলী সদস্যদের সমষ্টি যারা সংগঠনের অস্তিত্বের জন্য অপরিহার্য হলেও তারা নিজেরা পার্টি নিশ্চয়তা প্রদান করতে পারে না (খ) অভিজ্ঞ, তত্ত্ব-জ্ঞান সম্পন্ন ও সহনশীল অংশ—যারা পার্টি নেতৃত্ব গঠন করে এবং তাদের গুণাবলী তাদেরকে পার্টিঅস্তিত্বের মৌলিক উপাদানে পরিণত করে (গ) পার্টির লড়াকু সদস্যদের মধ্যবর্তী স্তর, যারা বাকি দুই স্তরের মধ্যে অতি গুরুত্বপূর্ণ ভৌতিক বা বস্তুগত, বুদ্ধিবৃত্তিগত ও নৈতিক আন্তঃসম্পর্ক বজায় রাখে। 

পার্টির মাধ্যমে জনগণের চেতনাকে বিপ্লবের স্তরে উন্নীত করার ক্ষেত্রে গ্রামসি নিজস্ব আপন বা অরগানিক (Organic) বুদ্ধিজীবির ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দেন। কারণ প্রতিকূল পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় শ্রমিক বুদ্ধিজীবি গড়ে ওঠার জন্য দরকার দীর্ঘ একটা কালপর্ব। এরা প্রথাগত বুদ্ধিজীবি নন বরং তারা শ্রমিক শ্রেণির আশা-আকাঙ্ক্ষা ও ঐতিহাসিক লক্ষ্যের সঙ্গে একাকার হয়ে যাবেন। প্রথাগত বুদ্ধিজীবিরা যেমন শাসক শ্রেণি কর্তৃক জনগণের ব্যাপক অংশকে নানা ভাবে বশীভূত রাখার ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করে, পার্টিকেও সেরকমভাবে শ্রমিক শ্রেণির নিজস্ব বুদ্ধিজীবি মারফৎ জনগণের বিভিন্ন অংশের মধ্যে সংযোগ গড়ে তুলতে হবে। 

পার্টি প্রশ্নে মাওসেতুঙের অবদান মাওসেতুঙ চিন্তাধারা বা মাওবাদ নামক তত্ত্ব কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত। যদিও এ নিয়ে নানা প্রশ্ন, সমালোচনা বিতর্ক ছিল ও এখনো চলছে। তবে নিঃসন্দেহে চীনের মত পশ্চাদপদ একটি দেশে বিপ্লবী পার্টি গড়ে তুলে ক্ষমতা দখল করে সমাজতান্ত্রিক বিনির্মানের দিকে এগিয়ে যাবার ক্ষেত্রে মাও-এর ভূমিকা স্মরণীয় হয়ে থাকবে। লেনিনের বিপ্লবী পার্টি সংক্রান্ত তত্ত্ব-কাঠামো সৃজনশীলভাবে অনুসরণ করে তিনি কৃষক নির্ভর গণধর্মী বিপ্লবী পার্টি গড়ে তোলেন। বুর্জোয়া গণতন্ত্রের অনুপস্থিতি ও আধা সামন্তবাদী সন্ত্রাসমূলক একনায়কত্বের বিরুদ্ধে চীনা বিপ্লব দীর্ঘস্থায়ী সশস্ত্র সংগ্রামের রূপ নেয়। এক্ষেত্রে তিনি নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের তত্ত্ব তুলে ধরেন। এই নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব হল—সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ, মুৎসুদ্দী পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে সর্বহারা শ্রেণির নেতৃত্বে শ্রমিক-কৃষক মৈত্রীর ভিত্তিতে ব্যাপক জনগণের দ্বারা চালিত বিপ্লব। পার্টির অধীনস্ত বিপ্লবী সামরিক বাহিনী—গণমুক্তিফৌজের মাধ্যমে ‘গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরাও’ করে তিনি এই বিপ্লব সম্পন্ন করেন। 

মূলতঃ কৃষকদের নিয়ে গঠিত একটি বিপ্লবী বাহিনীকে কীভাবে সর্বহারার শ্রেণি চেতনা সম্পন্ন সুশৃঙ্খল ও গণসম্পৃক্ত নতুন রূপের গণবাহিনীতে পরিণত করা যায়—সে সমস্যার সমাধান করেছিলেন মাও পার্টি গঠনের ধারায়। এক্ষেত্রে তাঁর নীতি ছিল—পার্টির আজ্ঞাধীন বন্দুক, বন্দুকের আজ্ঞাধীন পার্টি নয়। তাঁর মতে—নীতি ও কর্মকৌশল পার্টির প্রাণ ও পার্টির সব বাস্তব কর্মকাণ্ডের সূচনাবিন্দু ও লব্ধ ফল। বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, শ্রেণি বিন্যাস ও পরিবর্তনশীল বাস্তব অবস্থার প্রেক্ষিতে নীতি প্রণয়ন করতে হবে এবং কর্মনীতি ও নমনীয়তার সমন্বয় করতে হবে। মতাদর্শগতভাবে পার্টি গড়ার ওপর গুরুত্ব দিয়ে মাও বলেছেন—পার্টি সদস্যদের শুধু সাংগঠনিকভাবে নয়, মতাদর্শগতভাবেও পার্টিতে যোগ দেওয়া উচিত এবং অবিরামভাবে তাদের পেটিবুর্জোয়া ধ্যান ধারণা থেকে মুক্ত হয়ে সর্বহারার ধ্যান ধারণা আত্মস্থ করা তাদের কর্তব্য। পার্টির ভেতর থেকেই, নেতৃত্বের মধ্য থেকেই সংশোধনবাদী ও পুঁজিবাদী প্রবণতা প্রাধান্যশীল হয়ে উঠতে পারে—এ আশংকা থেকেই মাও পার্টিতে সমালোচনা—আত্মসমালোচনার পদ্ধতিতে শুদ্ধি অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। তাঁর এই বিশেষ অবদান ইতিহাসে ‘মহান সাংস্কৃতিক বিপ্লব’ রূপে অভিহিত—যা নানা বিরোধিতা ও সমালোচনার মুখোমুখি হয়। সব কিছুই জনগণের জন্য, সব ক্ষেত্রেই জনগণের ওপর নির্ভর করা এবং জনগণের থেকে আসা, জনগণের মধ্যে যাওয়া, জনগণই ইতিহাসের স্রষ্টা—এই মার্কসবাদী—লেনিনবাদী তত্ত্বের ভিত্তিতে তিনি পার্টির গণ লাইন বিকশিত করেছিলেন। আর এভাবেই পার্টি নেতৃত্ব জনগণকে সঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারে বলে তিনি মনে করেন। এ ক্ষেত্রে পার্টির আত্মমুখীনতাবাদ (subjectivism) সবচেয়ে বড় শত্রু বলে মাও বারংবার সতর্ক থাকতে বলেছেন। পার্টি নেতৃত্বের মধ্যে দ্বন্দ্ব-বিরোধ ও তার মীমাংসার ক্ষেত্রে তত্ত্বগত দিক নির্দেশনা মাও দিয়েছেন। দ্বন্দ্বের দুই রূপ—বৈরী ও অবৈরী—চিহ্নিত করে তার সমাধানের পথও তার কাছে আমরা পাই। 

হো চি মিন পরাধীন ভিয়েতনামে গেরিলাযুদ্ধের মাধ্যমে বিজয়ী হয়ে সমাজতন্ত্র বিনির্মাণের যে শিক্ষা সঞ্চিত করেছেন, তাঁর অবদানও পার্টি তত্ত্ব-জ্ঞানের ভান্ডারে অমূল্য সংযোজন। 

বর্তমান প্রেক্ষাপট

মার্কস-এঙ্গেলস-এর বিশ্ববীক্ষার আলোকে যে লেনিনীয় পার্টি তত্ত্ব-কাঠামো গড়ে উঠেছে তা আজও দেশে দেশে পাথেয়। অবশ্য এই তত্ত্ব ভান্ডার নানা জনের অবদানে এবং বিপ্লব ও বিপ্লবী আন্দোলনের অভিজ্ঞতার দ্বারা আরো সমৃদ্ধ হয়ে চলেছে। তবে ৫০-এর দশক থেকে বিশ্বের কতগুলো বিপ্লব, বিপ্লবী পার্টি ও বামপন্থী আন্দোলনের ক্রম বিকাশ আমরা লক্ষ্য করি যা মার্কসবাদী লেনিনবাদী পার্টির তত্ত্বকে হুবহু অনুসরণ করে না। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল—ফিদেল ক্যাস্ত্রোর নেতৃত্বে কিউবান বিপ্লব, বলিভিয়ায় গেরিলা যুদ্ধের দ্বারা ক্ষমতা দখলের লক্ষ্যে চে গুয়েভারার মহৎ অভিযান, চিলিতে সালভাদোর আলেন্দের নেতৃত্বে পপুলার ফ্রন্টের মাধ্যমে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা, উরুগুয়েতে টুপামরোস—জাতীয় মুক্তি ফ্রন্টের মার্কসবাদী-লেনিনবাদী শহুরে গেরিলা বাহিনীর সাময়িক সাফল্য এবং সর্বোপরি ফ্রান্সের প্যারিসে ১৯৬৮ সালের মে মাসে পার্টি নেতৃত্বকে প্রত্যাখ্যান করে ছাত্র-যুব বিপ্লব। অনুরূপভাবে ফিলিপাইন, কলোম্বিয়া, এঙ্গোলা সহ আরো কতগুলো দেশে আমরা এ ধরনের সশস্ত্র বিপ্লব প্রচেষ্টা দেখি যা ঠিক লেনিনের তত্ত্ব কাঠামোর মধ্যে পড়েনা। যদিও কিউবার বিপ্লব ছাড়া বিপুল আত্মত্যাগ সত্ত্বেও কোনোটিই কাংখিত বিজয় অর্জন করতে পারেনি। 

এরই ধারাবাহিকতায় আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনে চীন-সোভিয়েত বিভক্তি এবং তৎপবর্তী বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিপর্যয়ের প্রেক্ষাপটে সমাজতন্ত্র অভিমুখী নতুন ধরনের বিপ্লবী পার্টি ও বামপন্থার উদ্ভব প্রত্যক্ষ করি। ল্যাতিন আমেরিকার দেশগুলো বলশেভিক পার্টির মডেল বাছবিচারহীনভাবে গ্রহণ না করে পরিবর্তনশীল বাস্তবতায় সংযোজন-বিয়োজনের মাধ্যমে ‘একবিংশ শতাব্দীর সমাজতন্ত্র’ নির্মানের দিকে অগ্রসর হয়। এক্ষেত্রে রণনীতি ও রণকৌশলের যুগপোযোগী সংস্কার আনলেন তারা। ব্রাজিলের কমিউনিস্ট পার্টি পাওলো ফ্রেইরির ‘নিপীড়িতের শিক্ষা পদ্ধতি’র (Pedagogy of the oppress) আলোকে ভ্যানগার্ড পার্টি তত্ত্বকে অন্ধ অনুসরণ না করে গণশিক্ষা আন্দোলন গড়ে তোলে। নিকারাগুয়ায় সান্দিনিস্তারা তাদের বিপ্লবী লড়াইয়ে ‘মুক্তির ধর্মতত্ত্ব’ (Liberation Theology) এর অনুসারীরা যাজকদের অংশীদার করে নিল। গুয়াতেমালার রাজনৈতিক সংগঠন গরিবদের গেরিলা সেনাবাহিনী (Army of the Poor) আদিবাসীদের অন্তর্ভুক্ত করে এবং তাদেরকে বিপ্লবের অন্যতম মৌলিক চালিকা শক্তি রূপে স্বীকৃতি দেয়। 

এল সালভাদোরে কমিউনিস্ট গেরিলা কম্যান্ডান্ট হোরসে স্ক্যফিক হানদাল ঘোষণা করলেন—লাতিন আমেরিকার বিপ্লবী শক্তি কেবল কমিউনিস্টরা নয়, নতুন নতুন বিপ্লবী সামাজিক শক্তিরও উদ্ভব ঘটেছে যাদেরকেও নেতৃত্বে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। ভেনিজুয়েলায় জনগণের প্রয়োজন মেটাতে, জনগণের ব্যবস্থাপনায় ও জনগণের মালিকানায় উৎপাদন—এই তিন বাহুকে মিলিয়ে ‘ত্রিভূজ সমাজতন্ত্র’ (Triangular Socialism)-এর দিকে অগ্রসর হল। 

লাতিন আমেরিকার এ সব বিপ্লবী পার্টি ও তাদের বিপ্লবী আন্দোলনে আর একটি অনন্য ঘটনা হল নারীমুক্তি বিষয়টির সংযোজন। ল্যাটিন আমেরিকার বিপ্লবী নেত্রী ও মার্কসবাদ তাত্ত্বিক মার্তা হার্নেকর বিগত কয়েক দশকের এই নতুন পরিবর্তনগুলো অনুসন্ধান করেছেন। তিনি বিভিন্ন দেশের পার্টিগুলোর লেনিনীয় তত্ত্ব কাঠামোকে যান্ত্রিক, খন্ডিত ও অন্ধভাবে অনুসরণের ভুল-ত্রুটি-বিচ্যুতির কিছুকিছু তুলে ধরেছেন। এগুলো হল: 

ক) ভ্যানগার্ডিজম, ভার্টিকালিজম ও অথোরিটেরিয়াজম বা নেতৃত্ববাদ, ওপর থেকে নীচে বাদ ও কর্তৃত্ববাদ। এভাবে পার্টির, নির্দেশে আন্দোলনের গতিমুখ, নেতৃত্বের দায়িত্ব, সংগ্রামের প্ল্যাটফর্মের প্রশ্নটি মীমাংসিত হতো এবং সমাধানগুলো ধীরে ধীরে নীচের সামাজিক আন্দোলনগুলোর কাছে পৌঁছাতো। ফলে এসব সামাজিক আন্দোলনের বৃহত্তর স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর পরিকল্পনায় অংশ নিতে সামাজিক আন্দোলনগুলো বাধা পেত। 

খ) থিয়োরিজম ও ডগমাটিজম বা মততন্ত্রবাদ ও গোঁড়ামিবাদ—যা স্ট্র্যটেজিজম বা রণনীতিবাদে ঠেলে দিত। ফলে ঐতিহাসিক অবস্থার সুনির্দিষ্ট বিশ্লেষণ ছাড়াই বড় বড় রণনীতিগত লক্ষ্য নির্ধারিত হয়েছিল। যেমন-জাতীয় মুক্তি ও সমাজতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম। 

গ) বাস্তবতা বিশ্লেষণে একটি বিকৃত ঝঁনলবপঃরারংস বা আত্মগতবাদ—যা ‘ঐতিহাসিক আত্মগত অবস্থার’ (Subjective Condition) বিমূর্ত ধারণাকে সুনির্দিষ্ট করেছিল। ফলে অনুপযুক্ত রণনীতি—রণকৌশল অনুসৃত হয়েছিল। 

সংকট, দুর্বলতা ও এ অবস্থা থেকে উত্তরণের ক্ষেত্রে মার্তার অভিমত হল: গণতন্ত্রের ওপর পর্যাপ্ত গুরুত্ব প্রদান। কেননা এ যাবৎ গণতান্ত্রিক বিশেষণ প্রয়োগ করা হতো সমাজ-গণতন্ত্রীদের ক্ষেত্রে—যেনবা কমিউনিস্ট বিপ্লবী শক্তি সমূহ গণতান্ত্রিক নয়। আসলে গণতন্ত্র হচ্ছে জনগণের প্রিয় পতাকাগুলোর অন্যতম। গণতন্ত্রের সংগ্রাম সমাজতন্ত্রের সংগ্রাম থেকে পৃথক নয় বরং কেবল সমাজতন্ত্রের মধ্যেই গণতন্ত্র পূর্ণ বিকশিত হতে পারে। জনগণ যাতে মনে করে তারাই নায়ক, সেজন্য জনগণকে সহায়তা করতে হবে। কেবল শ্রমজীবী শ্রেণি নিয়ে চিন্তিত মজুরিপন্থা (Workerist) কর্মপন্থার বদলে নতুন বিষয়ের বহুত্বকে মান্যতা দিতে হবে এবং বৈষম্যের শিকার সব পক্ষের (নারী, আদিবাসী, বৃদ্ধ, প্রতিবন্ধী, যৌনকর্মী, লিঙ্গবৈচিত্র, প্রান্তিক ও দলিত জনগোষ্ঠী ইত্যাদি) স্বার্থ রক্ষায় দাঁড়াতে হবে, নীচমুখী সামরিক নেতার ধরন বদলে গণ শিক্ষক হতে হবে, যা জনগণের সঞ্চিত সব বিচক্ষণ শক্তিকে মুক্ত করতে পারে। 

ল্যাতিন আমেরিকার এই নয়া দিগন্ত লেনিনবাদী পার্টি ও বিপ্লবী আন্দোলন বিকশিত করার ক্ষেত্রে একটি সৃজনশীল গবেষণাগার রূপে উদ্দীপনার সৃষ্টি করেছে। যদিও এর পক্ষে-বিপক্ষে রয়েছে এবং তা থাকাই স্বাভাবিক। লেনিনের পার্টি ভাবনাকে আক্রমন শতবর্ষের বেশি সময় ধরে চললেও সাম্প্রতিককালে তা নতুন রূপ পরিগ্রহ করেছে। আর যারা সমালোচনা করছেন তারা সবাই যে সমাজতন্ত্রের শত্রু এবং পুঁজিবাদের বন্ধু তা নয়। ‘অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট’-এর ‘ওয়ান পারসেন্ট বনাম নাইনটিনাইন পারসেন্ট’ আন্দোলন, আরব বসন্ত, তাহরির স্কোয়ার অভ্যুত্থান লিবিয়া-তিউনিশিয়া-তুরস্কের গণ বিস্ফোরণ, দিল্লির কেজরিওয়ালের আমজনতা আন্দোলন এই সমালোচনাকে আরো উৎসাহিত করছে। আর এই আক্রমনের মূল (অনেক সময় গোপন) লক্ষ্যবস্তু হল লেনিনের অগ্রগামী পার্টির ধারণা। 

এই পর্বে প্রথাগত বুর্জোয়া পেটি বুর্জোয়া সমালোচনা নয়, ভ্যানগার্ড পার্টির বিরুদ্ধে সমালোচনা মুখর হলেন নানা বিপ্লবী ও র‌্যাডিকেল বুদ্ধিজীবীরা। নয়া মার্কসবাদী, পশ্চিমা মার্কসবাদী, উত্তর মার্কসবাদী, ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুল, উত্তর আধুনিক ভাবুকরা—যারা (মুষ্টিমেয় ব্যতিক্রম বাদে) আবার বিপ্লবী তৎপরতার সঙ্গে যুক্ত নন, কেবল একাডেমিক চর্চায় লিপ্ত—তাদের তরফে। সাম্প্রতিক কালে তীব্র হলেও এর উদ্ভব আসলে ৬০ দশকে—সোভিয়েত কেন্দ্রীক স্তালিন ও স্তালিন উত্তর বিতর্ক, হাঙ্গেরি ও চেকোস্লোভাকিয়ায় সোভিয়েত হস্তক্ষেপ তাদের মধ্যে স্বপ্নভঙ্গের বেদনা জাগায়। কিন্তু তারা সমাজতন্ত্র বিনির্মানের দুর্গম, জটিল, দ্বন্দ্ব-সংঘাতময় দূরহতাকে উপলব্ধি না করে বিপ্লবের তত্ত্বের প্রয়োগের ক্ষেত্রে ‘বিশুদ্ধতার পুজারি’তে (Purity fatigue) পরিণত হন। সমাজতন্ত্রের অভিজ্ঞতার ভুল ত্রুটি-দুর্বলতার সঠিক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে আগ্রহী না হয়ে কেবল সরল সমালোচনায় নিজেদের সঁপে দিলেন। শিশু সমেত ময়লা কাঁথা ছুড়ে ফেলার মত তারা পার্টি তত্ত্বকেই খারিজ করে বসেন। এদের মনে ক্রমশঃ এই ধারণা দানা বাঁধলো যে—পার্টি হল আত্মগতবাদ সর্বস্ব, স্বেচ্ছাচারী, জনগণকে হটিয়ে দিয়ে জনগণের বিকল্প, শ্রেণির স্থান দখলকারী, মুষ্টিমেয় নেতৃত্বের কতৃত্বাধীন। এভাবে তারা পার্টি তত্ত্ব ও নীতিকেই বাতিল ঘোষিত করেন। ফুকো থেকে অ্যালান বাদিউ সকলেই এই বিভ্রান্তি জ্বরে আক্রান্ত হলেন। মার্কসবাদী পন্ডিত ও মাও ভক্ত চার্লস বেটেলহাম পার্টি ও সমাজতন্ত্রের বিকৃতির জন্য স্তালিন নয়—লেনিনকেই অপরাধী বানালেন ১৯১৭ সালের বিপ্লবের পরেই সংসদ ভেঙ্গে দেবার দায়ে। এর পাশাপাশি বিজ্ঞান-প্রযু্িক্তগত বিপ্লবের ফলে পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থায় কাঠামোগত নানা অভূতপূর্ব পরিবর্তন শ্রমিক শ্রেণির মধ্যেও নানা বৈচিত্র্যতা আনলো। আর এসব মিলিতভাবে তাদের পার্টিবিহীন বিপ্লবের বিকল্প তত্ত্ব নির্মাণের দিকে প্রলুব্ধ করলো। এ ক্ষেত্রে কেউ কেউ হাল ছেড়ে কোনো বিকল্প নেই—বলে উদার গণতান্ত্রিক পুঁজিবাদেই পথ খুঁজতে থাকে। আবার অনেকে বহু বিকল্প থাকার কথা বলে সুনির্দিষ্ট কোনো বিকল্প পথ দেখাতে না পেরে অরাজনৈতিক, স্বেচ্ছাশ্রমধর্মী ও এনজিও কর্মকাণ্ডের দাওয়াই বাতলায় যেমন, সুশীল সমাজ তৎপরতা, অ্যাডভোকেসি, নেটওয়ার্কিং ক্যাম্পেইন, সেমিনার, ডায়ালগ। আর্জেন্টিনার আরনেস্তো লাকলাউ (Ernesto Laclau) ও তার সহযোদ্ধা চান্তাল মৌফে (Chantal Mouffe) ক্ষমতা দখল না করেই দুনিয়াকে বদলানোর নিদান দেন। তাদের মতে পুঁজিবাদী রাষ্ট্র টিকে আছে শ্রমিক শ্রেণির উদ্বৃত্ত আত্তীকরণের মাধ্যমে। তাই শ্রমিকরা এ ক্ষেত্রে নিজেদের প্রত্যাহার করলে এ ব্যবস্থা এমনিই ধ্বসে পরবে —বিপ্লব বা পার্টির দরকার হবে না। এটা আসলে এক ধরনের নিষ্ক্রিয় বিপ্লবীপনার দিকে ঠেলে দেয়া। 

অনেকে শ্রমিক শ্রেণির মুক্তিকামী বিপ্লবী ঐতিহাসিক ভূমিকার ওপর আর আস্থা রাখতে পারলেন না। এমনকি কেউ কেউ শ্রমিক শ্রেণির বিশ্বময় সজীব-সরব সংগ্রামী অস্তিত্বকে দেখতে ও বুঝতে চাইলেন না। ডানদিকের ড্যানিয়েল বেল—শ্রমিকশ্রেণির মৃত্যু ঘোষণা করলেন। অন্যদিকে বামপন্থী আন্দ্রেগজ তাদেরকে বিদায় জানালেন। আরেকদল আরো আগেই ঘোষণা দেন—“আমরা মার্কসবাদের চেয়ে আরো বৈপ্লবিক তত্ত্ব চাই।” আরব বসন্তের সময় বিপ্লবী বুদ্ধিজীবি নেগ্রী হার্থগার্ডিয়ান পত্রিকায় লিখলেন—“এরকমই একটা কিছু আমরা চেয়েছিলাম।” কারণ তার মতে পুঁজিবাদ, ক্ষমতা—এসব এখন নৈর্ব্যক্তিক, বাস্তব রূপ হীন। এখন অনুক্ষমতা, জৈবক্ষমতা, অনুসংগ্রাম, ডিজিটাল লেবার বা প্লাটফরম ইকোনমির যুগ। শ্রমিক শ্রেণিও তাই নৈর্ব্যক্তিক, খন্ড-বিখন্ড ও নানারূপী। ফলে পুঁজিবাদের বিরুদ্ধেশ্রমিকশ্রেণির সমষ্টিগত সংগ্রামও নৈর্ব্যক্তিক, অবয়বহীন। পুঁজি এখন এমপায়ার বা সাম্রাজ্য। কিন্ত কার বিরুদ্ধে কীভাবে লড়াই, কে শত্রু, কে মিত্র, কোথা থেকে শুরু করতে হবে ও কে করবে, পুঁজিবাদের শোষণ-বৈষম্য-নিপীড়নের বিরুদ্ধে লড়াইটা কীভাবে হবে—ক্ষমতা দখলের প্রশ্নে এসব মৌলিক প্রশ্নের জবাব তাদের কাছে নেই। আমরা জানি শ্রমজীবিরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে লড়ে ও এখনো লড়ছে। নানারূপী স্বতঃস্ফূর্ত গণবিক্ষোভও দেশে দেশে গড়ে উঠছে। কিন্তু এসবের কোনোটাই কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। বরং ফলাফল প্রত্যাশার বিপরীতেই চলে গিয়েছে। অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট থেকে দিল্লির কেজরিওয়ালের আমজনতার আন্দোলনের পরিণতিই এর প্রমাণ। 

অন্যদিকে পুঁজিবাদের সরকারি মুখপাত্ররা দেখার চেষ্টা করে—শ্রমিকদের আর সমষ্টিগত শ্রেণি প্রতিরোধের দরকার নেই। সরকারি-বেসরকারি নানা উদ্যোগের মাধ্যমে কিংবা আত্মকর্মসংস্থানের মাধ্যমে তাদের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটছে। তারা এখন পুঁজিবাদের শিকার নয়, বরং তারা একে মোকাবেলা করছে। 

এ সব পথবিকল্পের দিকে মনোযোগী অনুসন্ধান চালালে আমরা দেখতে পাবো যে, এ সবের অনেকখানিই নতুন বোতলে পুরানো মদ। মার্কস থেকে লেনিন—এই দীর্ঘ যাত্রাপথে অগ্রগামী পার্টিবিরোধী এই সব সমালোচনা বারংবার নানা রূপে উত্থাপিত হয়েছে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকে কাউটস্কি-বার্ণস্টাইন এবং ১৯০০-১৯১৪ সাল পর্যন্ত পার্টি গঠনের কালপর্বে লেনিন বিরোধী নানা জন কর্তৃক। ইতিহাস লেনিনের পক্ষেই রায় দিয়েছে। কিন্তু বর্তমান ঘরানার লেনিনীয় পার্টি সমালোচনার সবচেয়ে নেতিবাচক দিক হল—তা ব্যাপক তরুণদের বিপ্লবী সম্ভাবনাকে নস্যাৎ করছে। তাদের ব্যাপক অংশের মধ্যে পার্টি বিরোধী, সংগঠন বিরোধী এক ধরনের নৈরাশ্যবাদী প্রবণতার জন্ম দিচ্ছে। অনেকে আবার নিষ্ক্রিয় বিপ্লবীপনায় আচ্ছন্ন হয়ে আরাম কেদারার বিপ্লবী, ‘মেইনলাইন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অনলাইন তৎপরতা’র মাধ্যমে অনেক কিছু করে ফেলার বিভ্রান্তিতে ভুগছে। এরকম একটা সময়ে আজ আমরা দেখছি বিশ্বজনসংখ্যায় শ্রমিক শ্রেণির সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেখছি এবং প্রতিদিন এ সংখ্যা বৃদ্ধি ঘটছে। ২০২০ সালে মজুরি শ্রমিকের সংখ্যা এখন ২০০ কোটি ছাড়িয়ে গেছে। অথচ মার্কস-এঙ্গেলস যখন দুনিয়ার মজদুর শ্লোগান দেন—তখন সারা দুনিয়ায় মজুরি শ্রমিকের সংখ্যা ছিল বিশ্বজনসংখ্যার মাত্র ২ শতাংশ—সর্বোচ্চ ২ কোটি। ভারতে ২০২০ সালের সাধারণ ধর্মঘটে ২৫০ মিলিয়ন শ্রমিক অংশগ্রহণ করে, যা বিশ্ব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ধর্মঘট।

আজকের এই প্রেক্ষাপটে তাই লেনিনের পার্টি ভাবনাটাকে নতুন করে ঝালিয়ে নিতে হবে। মার্কসের শিক্ষায় যিনি দেখিয়েছেন—স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনের মাধ্যমে শ্রমিকরা বড় জোর ট্রেড ইউনিয়নে চেতনা পর্যন্ত অর্জন করতে পারে। কিন্তু সমাজ বিপ্লবের তত্ত্ব-জ্ঞান-চেতনা বাইরে থেকে সঞ্চারিত করতে হয়। এটা তাদের অক্ষমতা বা ব্যর্থতা নয়। বরং মার্কস অর্থনৈতিক ও দার্শনিক পান্ডুলিপিতে এর ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছেন—পুঁজিবাদ মানুষকে বিচ্ছিন্নতায় আক্রান্ত করে, তার মানব সত্তাকে পশুর স্তরে নামিয়ে নিয়ে আসে। ফলে প্রতিদিনের অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামে কাতর, শিক্ষণ-জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার সুযোগ-অবসর ও পরিবেশ থেকে বঞ্চিত শ্রমজীবিদের পক্ষে সমাজ বিপ্লবের উন্নত তত্ত্ব নির্মাণ সম্ভব হয়ে উঠে না। তাই এ ক্ষেত্রে ভূমিকা নেয় পার্টি। শ্রমিক শ্রেণির স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনের মধ্যে সমাজ বিপ্লবের সচেতনতার বীজ বপন করে। তাছাড়া ইতিহাসে কোনো শ্রেণি অগ্রবাহিনী ছাড়া ক্ষমতায় আসীন হতে ও স্থায়ী হতে পারেনি। তবে এই ভ্যানগার্ড যে সবসময় পার্টি রাজনীতিতে রূপ নিতে পেরেছে এমনটা নয়। অনেক দাস বিদ্রোহ, কৃষক বিদ্রোহে অগ্রগামী পার্টির কোন উপস্থিতি ছিলনা। কারণ শ্রেণির পার্টিরাজনীতি বেশি দিনের নয়, ফরাসী বিপ্লবের সময় এর উদ্ভব ঘটে। তাই শ্রেণির পার্টি আসলে স্বতঃস্ফূর্ততা থেকে সচেতনতার দিকে এর যাত্রা। পোল্যান্ডের বিখ্যাত মার্কসবাদী বুদ্ধিজীবি পুলনতাজ তার রাষ্ট্র ভাবনায় দেখিয়েছেন—পুঁজিবাদী রাষ্ট্র ও পার্টির কাজ হচ্ছে বুর্জোয়াদের একক নয়, সমষ্টিগত স্বার্থ রক্ষা করা। কখনও কখনও বুর্জোয়া রাষ্ট্রের আইন-কানুন, রীতি-নীতি-পদক্ষেপ বুর্জোয়া শ্রেণির কোনো অংশের বা একক কোনো বুর্জোয়ার বিরুদ্ধে যেতে পারে। বিশ্বের বহু দেশে এর প্রমাণ মেলে। কিন্তু তাতে পুঁজিবাদী রাষ্ট্র ও তার পার্টির সম্বন্ধে বিভ্রান্ত হবার অবকাশ নেই। ঠিক তেমনি অগ্রগামী পার্টি ছাড়া শ্রমিক শ্রেণির ক্ষমতা দখল ও তা সংহত করা সম্ভব নয়। আর এই অগ্রগামী পার্টি নিয়ে যে তর্ক-বিতর্ক-সমালোচনা, তার সুরাহা করা যায় মার্কস-এঙ্গেলস থেকে শুরু করে লেনিন ও লেনিন উত্তর পার্টি ভাবনার মনোযোগী পাঠ আত্মস্থ করার মাধ্যমে। তবে এর অর্থ এই নয় যে—সব কিছু ঠিকঠাক আছে বা সব কথা বলা হয়েছে। বরং লেনিনীয় পার্টি ধারণাকে বিকশিত করেই এগিয়ে যেতে হবে।

মন্তব্য

মন্তব্য লিখুন