তালাল আসাদ, ধর্মীয় পরিচয়-রাজনীতি ও ধর্মনিরপেক্ষতা
‘মানুষের চেতনা তাদের অস্তিত্বকে নির্ধারণ করে না; বরং তাদের সামাজিক অস্তিত্বই তাদের চেতনাকে নির্ধারণ করে।’
Karl Marx, A Contribution to the Critique of Political Economy (1859)
ভূমিকা
সাম্প্রতিক বাংলাদেশে সংখ্যাগুরু ধর্মীয় পরিচয় রাজনীতির এক উল্লেখযোগ্য প্রকাশ হলো ধর্মনিরপেক্ষতার বিরুদ্ধে তাত্ত্বিক বিরোধিতা। আগে যেখানে ধর্মনিরপেক্ষতাকে ‘অসাম্প্রদায়িকতা’ ও ‘রাষ্ট্রীয় নিরপেক্ষতা’ হিসেবে গণ্য করা হতো, এখন তা একধরনের ‘পশ্চিমা আধিপত্যবাদী আদর্শ’ হিসেবে চিত্রায়িত করা হচ্ছে। এই রাজনৈতিক কৌশলে সংখ্যাগুরু মুসলিম পরিচয়কে রাষ্ট্রের মৌলিক চেতনায় প্রতিস্থাপন করার প্রয়াস দেখা যাচ্ছে, যেখানে ইসলামকে শুধু ব্যক্তিগত বিশ্বাস নয়, বরং সামষ্টিক পরিচয় ও আইনগত কাঠামোর ভিত্তি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এই প্রবণতা ধর্মনিরপেক্ষতাকে একটি সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও স্থানীয়তা বিরোধী ধারণা হিসেবে চিহ্নিত করে তাকে প্রত্যাখ্যান করে।
এই প্রত্যাখ্যানকে তাত্ত্বিক ভিত্তি দেয় তালাল আসাদের ধর্ম ও সেক্যুলারিজম বিষয়ক সমালোচনা। আসাদ দেখিয়েছেন, ধর্মনিরপেক্ষতা কোনো নিরপেক্ষ বা সর্বজনীন নীতি নয়; বরং এটি একটি ঐতিহাসিকভাবে নির্মিত পশ্চিমা রাষ্ট্রিক-নৈতিক কাঠামো, যা ধর্মকে নিয়ন্ত্রণ ও প্রান্তিক করার মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। তার মতে, সেক্যুলারিজম নিজেই ক্ষমতার কাঠামোর অংশ, যা ধর্মকে ‘নির্বিশেষ ও বেসরকারি’ করে তুলতে চায়। এই বিশ্লেষণ বাংলাদেশের ইসলামপন্থী বুদ্ধিজীবীদের হাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক অস্ত্র হয়ে উঠেছে।
তালাল আসাদের চিন্তাকে ব্যবহার করে বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষতা বিরোধীরা যে রাজনৈতিক যুক্তি নির্মাণ করেন, তা অনেকাংশে নির্বাচিত ও খণ্ডিত পাঠের উপর নির্ভরশীল, ফলে এর তাত্ত্বিক ও বাস্তবিক সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট। আসাদ মূলত পশ্চিমা প্রেক্ষাপটে ধর্ম ও সেক্যুলারিজমের ক্ষমতা সম্পর্ক বিশ্লেষণ করেছেন; তিনি ধর্মনিরপেক্ষতার পরিবর্তে ধর্মরাষ্ট্রের পক্ষে কোনো সরল অবস্থান নেননি। তাদের যুক্তি একদিকে যেমন তাত্ত্বিকভাবে আংশিক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, অন্যদিকে রাজনৈতিকভাবে প্রতিক্রিয়াশীল ও কর্তৃত্ববাদী প্রবণতার উৎসাহদাতা। এই লেখার উদ্দেশ্য ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ ধারণাটিকে ঐতিহাসিক ও ভিন্ন রাজনৈতিক প্রেক্ষিতে বিবেচনা এবং ধর্মনিরপেক্ষতা বিরোধী তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক অবস্থান বিশ্লেষণ করা।
ধর্মীয় পরিচয়-রাজনীতি, সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মনিরপেক্ষতার ঐতিহাসিক বিকাশ
দ্বি-জাতি তত্ত্ব ও ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদ-ভিত্তিক রাজনৈতিক চেতনার উত্থান ঘটেছে মূলত ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বাস্তব রাজনৈতিক প্রয়োজনে। ‘ধর্মীয় পরিচয়-রাজনীতি’ ছিল ঔপনিবেশিক ক্ষমতার কাঠামোকে টিকিয়ে রাখার একটি কৌশল, যার মাধ্যমে উপমহাদেশের সমাজকে বিভক্ত ও নিয়ন্ত্রিত রাখা সম্ভব হয়েছে। সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী এবং জঙ্গিবাদী চেতনার প্রাথমিক ভিত্তি এই ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার বস্তুগত বাস্তবতার ভিতর নিহিত ছিল। এই প্রেক্ষাপটে ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণাও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে আবির্ভূত হয়, যা সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরুদ্ধ-অবস্থান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
এই অঞ্চলের রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব কেবল অভ্যন্তরীণ নয়, বরং বৈশ্বিক রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যেই নিহিত। উপনিবেশবাদ এখানে শুধু প্রভাবক নয়, বরং একটি নির্ধারক শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। আজকের উপমহাদেশে ধর্মীয় পরিচয়—রাজনীতি ও ধর্মনিরপেক্ষতার দ্বন্দ্ব অনুধাবনের জন্য ঐতিহাসিক, অভ্যন্তরীণ এবং বৈশ্বিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করা জরুরি। এই বিশ্লেষণের জন্য প্রাসঙ্গিক পশ্চিমা ও প্রাচ্য একাডেমিক রচনাও বিবেচনায় নিতে হবে। এই নিবন্ধের মূল উদ্দেশ্যই হলো ধর্মীয় পরিচয়-রাজনীতির উত্থান, সাম্প্রদায়িকতার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ, মৌলবাদের সন্ত্রাস এবং এর প্রতিক্রিয়ায় ধর্মনিরপেক্ষ চেতনার গঠনপ্রক্রিয়াকে সমন্বিতভাবে বিশ্লেষণ করা।
১. ধর্মীয় পরিচয় রাজনীতির বিকাশ ও ধর্মনিরপেক্ষতার জন্ম
মুঘল আমলেও শাসকের দৃষ্টিতে ধর্মীয় পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তবে তা কখনওই একটি সাংগঠনিক বা প্রাতিষ্ঠানিক রাজনৈতিক এজেন্ডায় রূপ নেয়নি। ধর্মীয় পরিচয়কে রাজনৈতিক অস্ত্রে রূপান্তরের সূচনা ঘটে ১৮৭১ সালের জনগণনার মাধ্যমে, যখন ব্রিটিশ প্রশাসন প্রথমবারের মতো ধর্মের ভিত্তিতে জনগণকে শ্রেণিবদ্ধ করে। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ হিন্দু-মুসলিম বিভাজনের রাজনৈতিক ভিত্তি রচনা করে, এবং ১৯০৯ সালের মোরলে-মিন্টো সংস্কার মুসলমানদের জন্য পৃথক নির্বাচনী ব্যবস্থার মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়।
এর ধারাবাহিকতায় ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়, যা ছিল উপমহাদেশে প্রথম ধর্মীয় পরিচয়ভিত্তিক রাজনৈতিক সংগঠন। পাল্টা প্রতিক্রিয়া হিসেবে হিন্দু মহাসভা (১৯১৫) এবং আরএসএস (১৯২৫) প্রতিষ্ঠিত হয়, যা হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী রাজনীতির ভিত্তি রচনা করে। ১৯৩২ সালের ‘কমিউনাল অ্যাওয়ার্ড’, যা তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী র্যামসে ম্যাকডোনাল্ড প্রবর্তন করেন, সাম্প্রদায়িক প্রতিনিধিত্বকে সাংবিধানিক বৈধতা দেয়।
এই অবস্থার বিরুদ্ধে বামপন্থী প্রভাবিত ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ধর্মভিত্তিক নির্বাচনের বিরোধিতা করে এবং জাতীয় মুক্তির আন্দোলনের মধ্যে ধর্মনিরপেক্ষ চেতনার রাজনীতি বিকাশ ঘটায়। এই ধর্মনিরপেক্ষতা ইউরোপীয় সেক্যুলারিজমের প্রতিলিপি ছিল না; বরং ‘সর্বধর্ম সমন্বয়’ ভিত্তিক একটি দক্ষিণ এশীয় চেতনা ছিল, যেখানে ধর্মকে একান্ত ব্যক্তিগত গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না রেখে আন্তঃধর্মীয় সহাবস্থানকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে (Nandz, 1998; Bhargava, 2010)।
ঔপনিবেশিক শাসন এখানে কেবল প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; ছিল একটি ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ (Divide and Rule) কৌশলের ধারাবাহিক প্রয়োগ, যা ধর্মীয় ভিন্নতাকে রাজনৈতিক বিভাজনের জন্য ব্যবহার করে। এই প্রক্রিয়ায় ধর্মীয় পরিচয় একটি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, যার বিরুদ্ধে ভারতীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলন সর্বধর্মীয় ঐক্যের ভিত্তিতে দাঁড়াবার প্রয়াস পায় (Chandra, 1989)।
২. রাজনৈতিক ইসলামের আবির্ভাব ও ফ্যাসিবাদী প্রভাব
১৯৩৪ সালে ‘তরজমানুল কোরআন’-এ মওলানা মওদুদীর লেখা নিবন্ধে ইউরোপীয় ফ্যাসিবাদী আদর্শের প্রতি প্রশংসা প্রকাশ করা হয়: ‘আজ আপনাদের সামনে জার্মানি ও ইটালির দৃষ্টান্ত মওজুদ আছে। হিটলার ও মুসোলিনি যে বিরাট শক্তি অর্জন করেছে সমগ্র বিশ্বে তা স্বীকৃত...’। এই চিন্তার ধারাবাহিকতায় ১৯৪১ সালে ‘জামায়াতে ইসলামি’ প্রতিষ্ঠিত হয়, যার লক্ষ্য ছিল ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েম করা (অযসধফ, ১৯৬৭)।
এটি ছিল উপমহাদেশে প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক ‘রাজনৈতিক ইসলাম’-এর আত্মপ্রকাশ, যা মুসলিম লীগের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও তার চেয়েও বেশি কট্টর ও রাষ্ট্রকেন্দ্রিক। ইসলাম এখানে কেবল ধর্ম নয়, একটি পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক দর্শন ও সাংবিধানিক কাঠামোতে পরিণত হয়। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক বৈধতার ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা এখানেই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে।
এই ঘটনাকে উপমহাদেশের সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদের সম্মিলিত সূচনাবিন্দু হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। জামায়াতে ইসলামির আদর্শিক কাঠামো ধর্মীয় পরিচয়কে রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে রূপান্তরের প্রক্রিয়া সূচিত করে, যা আজও দক্ষিণ এশীয় রাজনীতির বহু সমস্যার কেন্দ্রে অবস্থিত।
১৯৪০ থেকে ১৯৬০-এর দশক ছিল উপমহাদেশে ‘রাজনৈতিক ইসলাম’-এর প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশের প্রস্তুতিপর্ব। মওদুদীর নেতৃত্বে জামাতে ইসলামি, মিসরে হাসান আল বান্নার প্রতিষ্ঠিত ইখওয়ানুল মুসলিমিন (Muslim Brotherhood), ও অন্যান্য ইসলামপন্থী সংগঠনগুলো এই সময়ে ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থাকে রাজনৈতিক বাস্তবতা হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টায় এগিয়ে আসে। এর মাধ্যমে ধর্মীয় পরিচয় রাজনীতি কেবল আন্তঃধর্মীয় বিরোধেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং অন্তঃধর্মীয় সংঘাতেরও জন্ম দেয়, যেখানে মুসলমানদের মধ্যকার মতভিন্নতাকেও রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে মোকাবিলার একটি ইস্যু হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়।
৩. উপমহাদেশে ধর্মীয় পরিচয় রাজনীতির দ্বিতীয় পর্যায়: মৌলবাদের উত্থান ও সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদ
ঔপনিবেশিক যুগে শুরু হওয়া ধর্মীয় পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতি স্বাধীনতা-পরবর্তী দক্ষিণ এশিয়ায় এক নতুন রূপ পরিগ্রহ করে, যেখানে ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে কেবল সাংস্কৃতিক নয়, বরং রাষ্ট্রগঠনের মৌলিক ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়। ‘দ্বি-জাতি তত্ত্ব’-এর রাজনৈতিক প্রয়োগ একপর্যায়ে এমন মাত্রায় পৌঁছে যায় যে তা ১৯৪৭ সালের ভারত বিভাগের পটভূমি রচনা করে এবং এর ফলশ্রুতিতে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়। এই প্রক্রিয়ায় মুসলিম লীগের নেতৃত্বে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ভূমিকা ছিল কেন্দ্রীয়; যদিও এই রাজনৈতিক বাস্তবতা গঠনে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির সক্রিয় ভূমিকা একটি নির্ধারক উপাদান হিসেবে কাজ করেছে (Jalal, 1994)।
স্বাধীনতাত্তোর পাকিস্তানে ধর্মীয় পরিচয়ের এই রাজনীতি আরও কট্টর রূপ ধারণ করে। ১৯৫৩ সালে মওলানা মওদুদী তাঁর প্রবন্ধ The Qadiani Problem-এ আহমদিয়া সম্প্রদায়কে ‘অমুসলিম’ ঘোষণার পক্ষে ধর্মতাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক যুক্তি তুলে ধরেন। তিনি যুক্তি দেন, মুসলিম পরিচয় শুধু একটি জাতিগত শ্রেণি নয় বরং এর ‘বিশুদ্ধতা’ বজায় রাখা জরুরি, এবং সেই বিশুদ্ধতার নামে ‘অবাঞ্ছিত’ গোষ্ঠীকে মুসলিম জাতীয়তা থেকে বহিষ্কার করা প্রয়োজন। এই বর্ণবাদী ও ফ্যাসিবাদী দৃষ্টিভঙ্গি পাকিস্তানে আন্তঃমুসলিম সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ও কাদিয়ানিদের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী দাঙ্গার জন্ম দেয়। মওদুদীকে এই দাঙ্গায় উস্কানি দেওয়ার দায়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলেও তা পরে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক চাপের (বিশেষত মার্কিন-সৌদি প্রভাব) ফলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে রূপান্তরিত হয় (Nasr, 1996)।
পাকিস্তান সরকার ১৯৫৪ সালে বিচারপতি মুনিরের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিশন গঠন করে। এই ‘মুনির কমিশন রিপোর্ট’ প্রকাশ করে যে দেশের শীর্ষ ১০ জন ইসলামি চিন্তাবিদ পর্যন্ত ‘কে মুসলমান?’ এই প্রশ্নে কোনো ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেননি (Munir Report, 1954)। এই ঘটনাপরম্পরা দক্ষিণ এশীয় ধর্মীয় রাজনীতির একটি আন্তঃধর্মীয় সংকটকেই নির্দেশ করে, যেখানে রাজনৈতিক ইসলামের নামে মুসলিম সম্প্রদায়ের অভ্যন্তরেই বিভাজন সৃষ্টি হয়।
এই ধর্মীয় রাজনীতির প্রকাশভঙ্গি ক্রমে সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদের ভাষা গ্রহণ করে। যেমন, পাকিস্তানে ‘৯০ ভাগ মুসলমানের দেশ’, বাংলাদেশে ‘আমরা মুসলমান জাতি’, এবং ভারতে ‘হিন্দুরাষ্ট্র’—এসব শ্লোগান রাজনৈতিক বলয়ে ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার দাবিকে রাষ্ট্রীয় ন্যায্যতার ভিত্তি হিসেবে উপস্থাপন করে। এই সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদ কেবল রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সীমারেখা নির্ধারণে ব্যবহৃত হয়নি, বরং তা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক কাঠামো, নাগরিক অধিকার এবং জাতীয় পরিচয় নির্ধারণেও ব্যবহৃত হয়েছে। এর ফলে ধর্মীয় পরিচয় রাজনীতি ও মৌলবাদের পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ার একটি সংঘাতপূর্ণ চিত্র উপমহাদেশীয় রাজনীতিতে স্থায়ী হয়ে ওঠে।
৪. ধর্মীয় পরিচয় রাজনীতির বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক ও জঙ্গিবাদের উত্থান
১৯৭০-এর দশকে মধ্যপ্রাচ্য, বিশেষত সৌদি আরব, ধর্মীয় পরিচয় রাজনীতিকে একটি বৈশ্বিক প্রকল্পে পরিণত করে। সৌদি রাষ্ট্র ওহাবি মতবাদের আদর্শিক কাঠামো এবং বিপুল অর্থবিত্তের সহায়তায় আন্তর্জাতিক ইসলামি দাতব্য সংস্থাগুলোর (Islamic Charities) মাধ্যমে ‘রাজনৈতিক ইসলাম’ প্রচারে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। এই ধর্মীয়-রাজনৈতিক উদ্যোগ ধর্মীয় মৌলবাদের বিস্তারে যেমন ভূমিকা রাখে, তেমনি তা জঙ্গিবাদী সংগঠনের আদর্শিক ও আর্থিক ভিত্তি গঠনে সহায়ক হয় (Kepel, 2002)।
এই পর্যায়ে ধর্মীয় পরিচয় রাজনীতি শুধুমাত্র অভ্যন্তরীণ বিষয় থাকেনি; এটি যুক্তরাষ্ট্র-সোভিয়েত ঠান্ডা যুদ্ধের ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ইসলামকে সমাজতন্ত্র বিরোধী শক্তি হিসেবে কাজে লাগানোর কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এর উদাহরণ হিসেবে ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকাকে উল্লেখ করা যায়, যেখানে তারা ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী শক্তিকে পরোক্ষভাবে সমর্থন জানিয়েছিল।
এছাড়া, ১৯৬৭ ও ১৯৭৩ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ, ১৯৭৯ সালের ইরান বিপ্লব এবং একই বছরের আফগানিস্তানে সোভিয়েত আগ্রাসনের পরিপ্রেক্ষিতে সংঘটিত ‘জিহাদ’-এর মাধ্যমে ‘মুজাহিদিন’ নামক জঙ্গিগোষ্ঠীর উত্থান ঘটে। বিশেষ করে, আফগান যুদ্ধ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সহযোগিতায় বিশ্বজুড়ে একটি জিহাদি নেটওয়ার্ক গঠনের ক্ষেত্র প্রস্তুত করে দেয় (Coll, 2004)।
ইরান বিপ্লব রাজনৈতিক ইসলামের ধারণাকে নতুন বৈধতা দেয়। এই বিপ্লব পশ্চিমা একাডেমিয়াতেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। মিশেল ফুকো ১৯৭৮ সালে ইরানে গিয়ে বিপ্লবকে ‘ইচ্ছাশক্তির আত্মিক অভ্যুত্থান’ (political spirituality) হিসেবে আখ্যা দেন (Afary & Anderson, 2005)। যদিও তিনি পরে এর ইসলামি চরিত্র বা শিয়াপন্থী কর্তৃত্ববাদী পরিণতি নিয়ে মুখ খুলেননি, কিন্তু তাঁর পর্যবেক্ষণ ইসলামি বিপ্লবকে পাশ্চাত্য রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার এক বিকল্প হিসেবে ব্যাখ্যা করেছিল। এখানে লক্ষণীয় যে, পশ্চিমা একাডেমিয়া অনেক সময় রাজনৈতিক ইসলামের প্রতি একপ্রকার সহানুভূতির দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করে, যা পরবর্তীকালে ইসলামপন্থী রাজনীতির তাত্ত্বিক স্বীকৃতিতে ভূমিকা রেখেছে। এই বিতর্কে তালাল আসাদের মতো নৃতত্ত্ববিদদের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ, যাদের আলোচনা পরবর্তী পর্যায়ে বিশ্লেষণ করা হবে।
১৯৮০ থেকে ১৯৯০-এর দশকে ‘জিহাদি চরমপন্থা’ একটি বৈশ্বিক নেটওয়ার্কে পরিণত হয়। আল-কায়েদা (Osama bin Laden-এর নেতৃত্বে) প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৮৮ সালে। একই সময়ে ফিলিস্তিনে হামাস, লেবাননে হিজবুল্লাহ, পাকিস্তানে লস্কর-ই-তৈয়বার মতো সংগঠনগুলো ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ এবং সশস্ত্র চরমপন্থার সমন্বয়ে কার্যক্রম চালাতে থাকে। এইসব সংগঠন রাজনৈতিক ইসলাম ও জিহাদবাদকে একসূত্রে যুক্ত করে একটি সামরিক ও আদর্শিক কাঠামো গড়ে তোলে।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর টুইন টাওয়ার হামলা রাজনৈতিক ইসলাম ভিত্তিক চরমপন্থার একটি বৈশ্বিক ‘স্পেকটাকেল’ হয়ে ওঠে। এরপর ২০১৪ সালে আইএসআইএস (ISIS/Daesh) ইরাক ও সিরিয়ায় তথাকথিত ‘খিলাফত’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এক নতুন ধরনের ইসলামি রাষ্ট্র কল্পনার নির্মাণ করে, যা ছিল চূড়ান্ত সহিংস, বর্বর এবং মধ্যযুগীয় শাসনব্যবস্থার প্রতীকী পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা।
এই আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে বাংলাদেশেও জঙ্গিবাদ প্রবেশ করে। ১৯৮০-র দশকের মাঝামাঝি আফগান ফেরত মুজাহিদদের মাধ্যমে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে জিহাদি সংগঠনের ভিত্তি গড়ে ওঠে। এর মধ্যে জামায়াতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (JMB), হরকাতুল জিহাদ আল-ইসলামি (HUJI) ও আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের নাম উল্লেখযোগ্য। একটি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে মোট ১৩৩টি সক্রিয় জঙ্গি সংগঠনের অস্তিত্ব ছিল (Riaz, 2016)। এসব গোষ্ঠী বাঙালি ধর্মনিরপেক্ষ সাংস্কৃতিক চর্চার বিরুদ্ধে সশস্ত্র আক্রমণ চালাতে শুরু করে। বুদ্ধিজীবী, ব্লগার ও সংস্কৃতিকর্মী হত্যা এবং ২০১৬ সালের গুলশান হলি আর্টিজান হামলা এই জঙ্গিবাদের সহিংস পরিণতির উদাহরণ।
এই প্রেক্ষাপটে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদ ও জঙ্গিবাদ একটি পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত রাজনীতির কাঠামো গড়ে তোলে। একে রাজনৈতিক ইসলামের ‘পরিবার’ হিসেবেও ব্যাখ্যা করা যায়—যেখানে সাম্প্রদায়িকতা আদর্শিক ভিত্তি, মৌলবাদ সাংস্কৃতিক আধিপত্যের কৌশল, এবং জঙ্গিবাদ এর সশস্ত্র বাহিনী হিসেবে কাজ করে। এই তিনটি উপাদান মিলেই একটি সমন্বিত রাজনৈতিক প্রকল্পের রূপ নেয়, যার লক্ষ্য থাকে রাষ্ট্র ও সমাজের কাঠামোতে ইসলামপন্থী আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা।
৫. ধর্মীয় পরিচয় রাজনীতি ও একাডেমিয়া: মৌলবাদের পক্ষে-বিপক্ষে বয়ান
ক) হান্টিংটনের ‘সভ্যতার সংঘাত’ তত্ত্ব ও ইসলামি পরিচয় রাজনীতির ধারণা
১৯৮৯ থেকে ১৯৯১ সালের মধ্যে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের মধ্য দিয়ে ঠান্ডা যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে এবং যুক্তরাষ্ট্র একক বিশ্বশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। এই প্রেক্ষিতে ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা (Fukuyama, 1992) তাঁর আলোচিত The End of History? প্রবন্ধে যুক্তি দেন যে, ইতিহাসের আদর্শিক দ্বন্দ্বের অবসান ঘটেছে, এবং পশ্চিমা উদার গণতন্ত্র মানব সভ্যতার সর্বশেষ পর্যায় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
এই অবস্থানকে চ্যালেঞ্জ করে স্যামুয়েল পি. হান্টিংটন (Huntington, 1993) ‘The Clash of Civilization’ প্রবন্ধে বলেন, ইতিহাসের শেষ নয়, বরং নতুন ধরনের সংঘাত শুরু হবে—এটি হবে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয় ভিত্তিক। তাঁর মতে, জাতিগোষ্ঠী বা আদর্শগত দ্বন্দ্বের জায়গা দখল করবে ‘সভ্যতার’ মধ্যকার সংঘাত। এ প্রেক্ষাপটে তিনি ইসলামকে কেবল একটি ধর্ম নয়, বরং একটি স্বতন্ত্র ‘সভ্যতা’ হিসেবে চিহ্নিত করেন, যার মূল্যবোধ ও ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা পশ্চিমা সভ্যতার থেকে মৌলিকভাবে পৃথক।
এই তত্ত্বের পিছনে বাস্তব রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও ছিল সুস্পষ্ট। ১৯৭০ ও ৮০-এর দশকে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ায় রাজনৈতিক ইসলামের উত্থান হান্টিংটনের বিশ্লেষণকে উৎসাহিত করেছিল। মিশরে মুসলিম ব্রাদারহুড-এর উত্থান, পাকিস্তানে জেনারেল জিয়াউল হকের ইসলামায়ন (Islamization) কর্মসূচি, ১৯৭৯ সালে ইরানের ইসলামি বিপ্লব, একই বছরের আফগান জিহাদে মার্কিন-পাকিস্তানি সমর্থন এবং বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে ইসলামপন্থী রাজনীতির পুনরুত্থান এই ধারা স্পষ্ট করে তোলে। ইসলামি পরিচয় রাজনীতি একটি স্থানীয় নয় বরং আন্তঃরাষ্ট্রীয় প্রকল্পে রূপান্তরিত হয়, যা একধরনের ‘সাম্যবাদ বিরোধী’ জোট গঠনের অংশ হিসেবেই দেখা যায়।
হান্টিংটন এই প্রবণতাগুলোকে একটি বৃহৎ সভ্যতাগত সংঘাতের নিদর্শন হিসেবে দেখেন। তাঁর মতে, ‘Islam has bloody borders’—এই উক্তিটি আলোচনার কেন্দ্রে পরিণত হয়, যা ইসলামকে সংঘর্ষপ্রবণ ও সহিংসতামুখী সভ্যতা হিসেবে চিত্রিত করে। হান্টিংটনের প্রধান সমালোচনা দুই ধরনের, এটি একটি ‘একক পরিচয়ের ফাঁদ’ এবং ইসলামি পরিচয় রাজনীতির বাস্তবতা আছে, যা সমালোচনার মধ্যেও ‘রাজনৈতিক ইসলামের’ বা ‘মৌলবাদের’ স্বীকৃতি।
শুরু থেকেই ‘সভ্যতার সংঘাত’ তত্ত্ব একাডেমিক মহলে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি করে। এডওয়ার্ড সাঈদ (Said, 2001) এই ধারণার ব্যঙ্গাত্মক সমালোচনা করেন ‘The Clash of Ignorance’ প্রবন্ধে, যেখানে তিনি একে আধুনিক ওরিয়েন্টালিজমের রূপ বলে আখ্যায়িত করেন। তাঁর মতে, হান্টিংটনের তত্ত্ব সংস্কৃতি ও ধর্মকে অপরিবর্তনীয় ব্লকে ভাগ করে বাস্তবতাকে সরলীকরণ করে এবং পশ্চিমা সামরিক হস্তক্ষেপকে আদর্শিক ন্যায্যতা প্রদান করে।
অমর্ত্য সেন (ঝবহ, ২০০৬) তাঁর Identity and Violence: The Illusion of Destiny গ্রন্থে হান্টিংটনের ‘একক পরিচয়’ (single identity) আরোপকে বিপজ্জনক বলে অভিহিত করেন। তাঁর মতে, মানুষের পরিচয় বহুমাত্রিক, এবং একক ধর্মীয় পরিচয়কে প্রাধান্য দিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষণ করলে সহিংসতা উৎসাহিত হতে পারে। তিনি সভ্যতার সংঘাতের বিপরীতে পরিচয়ের জটিলতা বোঝার ওপর গুরুত্ব দেন।
নোয়াম চমস্কি (Chomsky, 2001) এই তত্ত্বকে সরাসরি ‘সাম্রাজ্যবাদী আদর্শিক হাতিয়ার’ হিসেবে চিহ্নিত করেন, যা পশ্চিমা বিশ্বের ভূরাজনৈতিক হস্তক্ষেপকে ন্যায্যতা দিতে ব্যবহৃত হয়। তাঁর মতে, ‘সভ্যতার সংঘাত’ নয় বরং পশ্চিমা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক আধিপত্যের টিকে থাকার লড়াই এই ধরনের তাত্ত্বিক কাঠামোর অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য।
হান্টিংটনের তত্ত্ব যত বিতর্কিতই হোক না কেন, ইসলামি পরিচয় রাজনীতির বৈশ্বিক উত্থানকে উপেক্ষা করাও সম্ভব নয়। রাজনৈতিক ইসলামের বাস্তবতা, রাষ্ট্রভিত্তিক ও অ-রাষ্ট্রভিত্তিক (non-state) শক্তিগুলোর জঙ্গিবাদী কার্যক্রম, এবং ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ—এসবই বিংশ ও একবিংশ শতকের ভূ-রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ফলে একদিকে যেমন হান্টিংটনের তত্ত্ব সাংস্কৃতিক সার্বিকতার নামে বিভাজনমূলক ও হস্তক্ষেপবাদী ন্যারেটিভকে প্রতিনিধিত্ব করে, অন্যদিকে এটি একটি বাস্তব রাজনৈতিক প্রবণতার তাত্ত্বিক প্রতিফলন হিসেবেও দেখা যায়।
খ. সমাজবিজ্ঞানের পদ্ধতিতে মৌলবাদের তুলনামূলক বিশ্লেষণ
ইসলামি পরিচয় রাজনীতি কী শুধুমাত্র ইসলাম ধর্মের ভেতরকার একক বৈশিষ্ট্য, নাকি এটি একটি বৃহত্তর বৈশ্বিক প্রবণতা যার প্রতিফলন অন্যান্য ধর্মীয় সম্প্রদায়েও বিদ্যমান? এই প্রশ্ন থেকেই জন্ম নেয় ‘Fundamentalism Project’—একটি একাডেমিক গবেষণা যা ধর্মীয় মৌলবাদের তুলনামূলক ও আন্তঃধর্মীয় বিশ্লেষণ প্রদান করে।
মার্টিন ই মার্টি (Martin E Marty) এবং আর স্কট অ্যাপলবি (R Scott Appleby)-এর তত্ত্বাবধানে এই প্রকল্প ১৯৮৮ সালে শুরু হয়, সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে যুক্ত হয় The American Academy of Arts and Sciences Ges University of Chicago Divinity School। গবেষণার উদ্দেশ্য ছিল ২০টিরও বেশি দেশে ইসলাম, খ্রিষ্টধর্ম, ইহুদিধর্ম, হিন্দুধর্ম, বৌদ্ধধর্মসহ বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ে মৌলবাদের উত্থানকে সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করা।
এই গবেষণার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো: এটি ধর্মীয় মৌলবাদকে কেবল ধর্মতাত্ত্বিক বা টেক্সট-ভিত্তিক ব্যাখ্যার বদলে রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার আলোকে বিশ্লেষণ করে। মৌলবাদ এখানে ধর্মের বিমূর্ত নীতি নয়, বরং ধর্মীয় অনুগামীদের বাস্তব রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আচরণের প্রতিফলন হিসেবে বিবেচিত।
হান্টিংটনের ‘সভ্যতার সংঘাত’ তত্ত্ব যেভাবে ইসলামকে একটি সংঘর্ষময় সভ্যতা হিসেবে চিত্রিত করে, তা একধরনের মনোআধিপত্যমূলক ব্যাখ্যা যা একক ধর্মীয় পরিচয়ের ওপর ভিত্তি করে সহিংসতা বিশ্লেষণ করে। অন্যদিকে, মৌলবাদ প্রকল্প এই দ্বৈতবাদী কাঠামো ভেঙে দিয়ে দেখায় যে ধর্মীয় মৌলবাদ কেবল ইসলাম নয়—বরং আধুনিকতাবিরোধী এক বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়া যা নানা ধর্মের মধ্যে ভিন্ন রূপে প্রকাশ পায়।
এই বিশ্লেষণ ভিটগেনস্টাইনের ‘Family Resemblance’ তত্ত্বের আলোকে গঠিত, যা বলে যে মৌলবাদের কোনো একক সার্বজনীন সংজ্ঞা নেই, তবে কিছু অভিন্ন বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা ভিন্ন ধর্মের মৌলবাদীদের মধ্যে সাদৃশ্য স্থাপন করে। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত: (১) পবিত্র গ্রন্থকে নির্ভুল ও চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচনা; (২) ‘আমরা বনাম তারা’ ধরনের দ্বৈতবাদী নৈতিকতা; (৩) ধর্মনিরপেক্ষতা ও বহুত্ববাদের বিরোধিতা; (৪) কর্তৃত্ববাদী বা ক্যারিশম্যাটিক নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য; (৫) ঐতিহ্যের নির্বাচিত পুনরুদ্ধার, এবং (৬) সহিংসতা বা জঙ্গি প্রবণতা যেমন জিহাদ, ‘জয় শ্রীরাম’, বা ধর্মযুদ্ধের ধারণা।
গ) মৌলবাদী সহিংসতার প্রতিক্রিয়া; সমাজবিজ্ঞানের বদলে রাজনৈতিক প্রতর্ক (নয়া-নাস্তিকতা)
স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বে যখন ধর্মীয় পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতির উত্থান সমাজবিজ্ঞান ও ধর্মতত্ত্ববিদদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে, তখন Martin E. Marty I R. Scott Appleby ধর্মভিত্তিক সহিংসতা ও রাজনৈতিক উগ্রতার সমস্যাটিকে ‘Fundamentalism’ বা মৌলবাদ হিসেবে বিশ্লেষণ করেন। এই প্রেক্ষাপটে পাল্টা প্রতিক্রিয়া হিসেবে এক ধরনের তীব্র বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিস্পন্দন দেখা যায়, যা ‘New Atheism’ বা ‘নিও-এথিজম’ নামে পরিচিতি পায় এবং বিশেষত পাশ্চাত্যের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত তরুণদের মধ্যে দারুণ জনপ্রিয়তা অর্জন করে।
নিও-এথিজমের প্রধান মুখপাত্র রিচার্ড ডকিন্স, স্যাম হ্যারিস, ক্রিস্টোফার হিচেন্স ও ড্যানিয়েল ডেনেট ধর্ম ও তার সামাজিক-রাজনৈতিক অভিপ্রায়কে কেবল প্রশ্নবিদ্ধই করেন না; বরং তারা ধর্মের মৌলিক ভিত্তি—ঈশ্বরে বিশ্বাস, ঐশী গ্রন্থ, পরকাল ও ধর্মীয় কর্তৃত্ব—সবকিছুকেই যুক্তিহীন, অপ্রমাণিত ও বিপজ্জনক বলে আখ্যায়িত করেন। ডকিন্স তাঁর বহুল আলোচিত গ্রন্থ The God Delusion-এ ধর্মকে এক ধরনের ‘ভ্রান্ত ধারণা’ (delusion) হিসেবে চিহ্নিত করেন। হ্যারিস স্পষ্টভাবে বলেন, ‘Moderate religion makes fundamentalism possible,’ অর্থাৎ তথাকথিত ‘মধ্যপন্থী’ ধর্মও মৌলবাদের জন্য একটি সহনীয় সাংস্কৃতিক জমি তৈরি করে দেয়।
নিও-এথিজম তাই শুধু মৌলবাদ নয়, বরং ধর্ম নামক সমগ্র কাঠামোকে যুক্তিবাদের আলোয় প্রত্যাখ্যান করার এক আধুনিক বুদ্ধিবৃত্তিক প্রকল্প। এরা মানবতাবাদ, বিজ্ঞান ও যুক্তির উপর ভিত্তি করে এক বিকল্প নৈতিক ব্যবস্থা গঠনের স্বপ্ন দেখেন। তবে এই যুক্তিভিত্তিক ‘ধর্মবিরোধিতা’ যখন মুসলিম-প্রধান দেশগুলোর প্রেক্ষাপটে স্থানান্তরিত হয়, তখন তা আরও জটিল রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়। বিশেষত বাংলাদেশে, ২০১০ সালের পর থেকে একাধিক ব্লগার হত্যাকাণ্ড এই নিও-এথিস্ট বুদ্ধিবৃত্তিক চেতনার বিরুদ্ধে মৌলবাদী প্রতিশোধপরায়ণতার এক মর্মান্তিক উদাহরণ হয়ে ওঠে।
এখানে প্রশ্ন ওঠে: নিও-এথিজম কি কেবল মৌলবাদের বিরুদ্ধে একটি ‘যুক্তিনিষ্ঠ’ প্রতিক্রিয়া, নাকি এটি ধর্মের সামাজিক ও মানবিক পরিসর উপেক্ষা করে একরৈখিক প্রত্যাখ্যানবাদে পরিণত হয়েছে? সমাজবিজ্ঞানী Wilfred Cantwell Smith ধর্মকে দুটি স্তরে দেখার পরামর্শ দেন: ব্যক্তিগত বিশ্বাস (faith) এবং ঐতিহ্যগত প্রাতিষ্ঠানিক রূপ (cumulative tradition)। তাঁর মতে, কেবল বাহ্যিক ধর্মীয় কাঠামোর প্রতিক্রিয়া হিসেবে মৌলবাদের জন্ম হয়, আবার সেই কাঠামোকে পুরোপুরি বাতিল করাও মানুষের নৈতিক অনুসন্ধান ও সামাজিক অন্তর্গত কাঠামোকে অস্বীকার করার শামিল।
সুতরাং নিও-এথিজম মৌলবাদের বিপরীতে দাঁড়ালেও, এটি ধর্মের জটিল সাংস্কৃতিক, নৈতিক ও মানসিক বাস্তবতাকে একপাক্ষিকভাবে ব্যাখ্যা করার ঝুঁকিতে পড়ে। ফলে, মৌলবাদ, ধর্ম ও নিও-এথিজম—এই তিনটি ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত ধারণাকে একটি সংলাপমুখর ও সমালোচনামূলক বিশ্লেষণের আওতায় আনা জরুরি।
ঘ) নিও-এথিজমের বিরোধিতা: সমাজবৈজ্ঞানিক ও মার্কসবাদী সমালোচনা
নিও-এথিজম আধুনিক ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে একটি যুক্তিনিষ্ঠ প্রতিক্রিয়া হলেও, সমাজবিজ্ঞান ও মার্কসবাদী সমালোচকরা এটিকে একরৈখিক, পশ্চিমকেন্দ্রিক এবং প্রায়শই রাজনৈতিকভাবে বিপজ্জনক বলে মনে করেন। এটি যুক্তিবাদকে একমাত্রিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে ধর্মের জটিল মানবিক ও সামাজিক বাস্তবতাকে অস্বীকার করে এবং কখনও কখনও সাম্রাজ্যবাদের আধিপত্যবাদী রাজনীতিকে নৈতিক আশ্রয় দেয়।
নিও-এথিস্টরা ধর্মকে কেবলমাত্র যুক্তিহীন, কুসংস্কারাচ্ছন্ন ও সহিংসতার উৎস হিসেবে উপস্থাপন করেন। কিন্তু সমাজবিজ্ঞানীরা যেমন Émile Durkheim, Clifford Geertz I Peter Berger দেখিয়েছেন, ধর্ম কেবল বিশ্বাসের কাঠামো নয়—বরং এটি সামাজিক সংহতি, নৈতিক কাঠামো এবং পরিচয় গঠনের এক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। নিও-এথিজম ধর্মের এই সামাজিক ও নৈতিক ভূমিকা একরৈখিকভাবে প্রত্যাখ্যান করে।
পশ্চিমের বামপন্থীদের নিও-এথিজম সম্পর্কে সমালোচনা হচ্ছে যে এরা ‘ইসলামকে’ বিশেষভাবে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু করে (বিশেষ করে হ্যারিস ও হিচেন্স), যার ফলে তাদের অনেক বক্তব্য ইউরোপে আমেরিকায় ‘ইসলামফোবিক রাজনীতির’ অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে। Sam Harris প্রায়শই দাবি করেন যে, ইসলাম ‘বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক ধর্ম’। এর ফলে নিও-এথিজম অনেক সময় পশ্চিমা সামরিক হস্তক্ষেপ বা ‘War on Terror’-এর নৈতিক বৈধতাকে পরোক্ষভাবে সমর্থন করেছে। একই সঙ্গে নিও-এথিস্টরা ধর্মের প্রতি যে বেপরোয়া বিদ্বেষ দেখান, তা অনেক সময় ঔপনিবেশিক ‘civilizing mission’-এর পুনরাবৃত্তির মতো শোনায়, যেখানে ধর্মবিশ্বাসী তৃতীয় বিশ্বের মানুষদের ‘মুক্তি’র জন্য যুক্তিবাদী পশ্চিমা চিন্তাবিদরা যেন আত্মনির্ধারিত রক্ষাকর্তা হয়ে ওঠেন। এই ধারা একধরনের বৌদ্ধিক সাম্রাজ্যবাদ (intellectual imperialism) তৈরি করে।
মার্কসবাদের দৃষ্টিতে ধর্ম হলো একটি সামাজিক প্রতিক্রিয়া—‘the sigh of the oppressed creature’ (Marx, Critique of Hegel’s Philosophy of Right, 1844)। নিও-এথিজম এই জটিল বাস্তবতা উপেক্ষা করে ধর্মকে শোষণের মূল উৎস হিসেবে চিহ্নিত করে, যেখানে মার্কসবাদ বলছে, ধর্ম শোষণের ফল, কারণ নয়। নিও-এথিজম ধর্মীয় মৌলবাদের পেছনের সামাজিক-অর্থনৈতিক শর্ত যেমন দারিদ্র্য, ঔপনিবেশিক শাসনের উত্তরাধিকার, কিংবা বৈষম্যমূলক রাষ্ট্রনৈতিক কাঠামোর কথা খুব কম বলে। কিন্তু মার্কসবাদী ও নব্য-মার্কসবাদী চিন্তাবিদেরা যেমন Slavoj Žižek, Terry Eagleton, ধর্মের সামাজিক ভূমিকা ও পুনরুৎপাদন অনেক বেশি রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে সম্পর্কিত। কিন্তু নিউ-এথিজম প্রবক্তাদের লেখা, বক্তৃতা, মিডিয়া উপস্থিতি ইত্যাদি একধরনের ‘Atheist Celebrity Culture’ তৈরি করে, যা পুঁজিবাদের ‘commodification of dissent’ বা প্রতিবাদকে পণ্যে রূপান্তরের একটি উদাহরণ হিসেবে দেখা যায়। টেরি ঈগলটন যেমন বলেছিলেন, ‘New Atheism is not radical enough, because it leaves capitalism untouched.’
ঙ) ‘ধর্ম’ নয় ‘ধার্মিকতা’: ধর্মীয় পরিচয়-রাজনীতির তথা মৌলবাদের সমাজবৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান
নয়া-নাস্তিকতার সমালোচনার মধ্য দিয়ে আবার ফেরা হয় সমাজবিজ্ঞানের ও সমাজ-মনোবিজ্ঞানের তাত্ত্বিক কাঠামো ও পদ্ধতিতে ধর্মীয় পরিচয়-রাজনীতির বিশ্লেষণে, যেখানে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে সমাজবিজ্ঞানী Emile Durkheim, Wilfred Cantwell Smith, কার্ল মার্কসসহ মার্কসবাদী তাত্ত্বিক ও পরবর্তীতে ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের বিচারবাদী তাত্ত্বিকদের (Critical Theory) লেখায়।
সমাজবিজ্ঞানের গবেষণার বিষয় ‘ধর্ম’ নয় ‘ধার্মিকতা’, অর্থাৎ বিমুর্ত তত্ত্ব নয় বাস্তব মানুষ ও সেই মানুষের আচরণ ও সামাজিক প্রেক্ষিত হচ্ছে গবেষণার বিষয়। সমাজবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বিশ্লেষণমুখী পদ্ধতি, যা ধর্মকে কেবল ঈশ্বর বা পরলোকবিশ্বাসের ভিত্তিতে নয়, বরং মানুষের সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতার অংশ হিসেবে বিশ্লেষণ করে। যেমন, ইসলাম ধর্ম ধারণা হিসেবে জটিল কিছু নয়, একেশ্বরবাদ ও চারটি রিচুয়াল (নামাজ, রোজা, হজ্ব, জাকাত)। সমাজবিজ্ঞান গবেষণার কেন্দ্রে নিয়ে আসে ‘ইসলাম’ নয় ‘মুসলমান’কে। অর্থাৎ যারা ইসলাম ধর্মের অনুসারী তাদের ধর্মবোধ, আচরণ, সামাজিক ভূমিকা, আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, ক্ষমতা সম্পর্ক ইত্যাদি।
Durkheim ধর্মকে ব্যক্তিগত বিশ্বাস বা অলৌকিক অভিজ্ঞতা হিসেবে নয়, বরং একটি সামাজিক বাস্তবতা হিসেবে বিশ্লেষণ করেন। Durkheim-এর মতে, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান বা রিচ্যুয়াল (ritual) হলো সামাজিক সংহতির (social cohesion) বাহক। এটি মানুষের মধ্যে সম্মিলিত চেতনার বোধ জাগিয়ে তোলে। যেমন টোটেম (totem) হলো কেবল কোনো প্রাণী বা প্রতীক নয়, বরং গোত্রের সমষ্টিগত পরিচয় ও চেতনার প্রতীক। ধর্মীয় আচার মানুষকে সামাজিকভাবে একত্রিত করে এবং ব্যক্তির চেয়ে বৃহত্তর কোনো কিছুর অংশ হওয়ার অনুভূতি দেয়। Durkheim ধর্মের উৎস বোঝার জন্য ইউরোপীয় বড় ধর্মগুলো নয়, বরং প্রাচীনতম ও আদিম সমাজ—অস্ট্রেলিয়ার Arunta আদিবাসীদের ধর্মীয় আচার ও বিশ্বাস পদ্ধতি বিশ্লেষণ করেন। ঐতিহাসিকভাবে সৃষ্ট প্রাথমিক ধর্মীয় কাঠামো বিশ্লেষণের মধ্য দিয়েই ধর্মের সার্বিক গঠন ও উদ্দেশ্য বোঝার চেষ্টা করেন। এক কথায় তার পদ্ধতি ছিল ‘বিমূর্ত’ ধর্ম বা ধর্মের টেক্সট নয়, মানুষ ও সেই মানুষের সমাজ। সমাজতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞানভিত্তিক পর্যবেক্ষণ ও তুলনামূলক বিশ্লেষণ সম্ভব। [Emile Durkheim, ‘The Elementary Forms of Religious Life’ (1912)]।
Wilfred Cantwell Smith (১৯১৬–২০০০) ধর্মতত্ত্ববিদ ও ধর্মতত্ত্বের ইতিহাসবিদ, যিনি ‘ধর্ম’ (religion) ধারণাটির আধুনিক ব্যবহার ও বিশ্লেষণকে চ্যালেঞ্জ করেন। তিনি ধর্ম নিয়ে বিশ্লেষণে একটি মানবিক, আন্তঃব্যক্তিক ও ঐতিহাসিক পদ্ধতি গ্রহণ করেন। তাঁর বিখ্যাত বই ‘The Meaning and End of Religion’ (১৯৬২)-এ তিনি যুক্তি দেন যে, ‘religion’ একটি reified ধারণা—অর্থাৎ, এটিকে যেন একটি বস্তু বা স্বতন্ত্র সত্তা হিসেবে ভাবা হয়, অথচ এটি বাস্তবে এমন নয়। তিনি ধর্মকে কোনো নির্দিষ্ট ‘সিস্টেম’ বা প্রতিষ্ঠিত মতবাদ হিসেবে না দেখে বলেন: ‘We must studz persons, not religions’, এবং তাঁর মতে, প্রত্যেক ব্যক্তির ধর্মীয় জীবন স্বতন্ত্র এবং তা ইতিহাসের প্রেক্ষিতে গঠিত, পরিবর্তনশীল। মূলত এখানে স্মিথ ধর্মগুলোর প্রতি ‘essentialist’ দৃষ্টিভঙ্গির বিরোধিতা করেছেন। এখানে ধর্ম যে একটি reified ধারণা এবং আমাদের অবশ্যই ‘ধর্ম’ নয় ‘ধার্মিক’কে অধ্যয়ন করতে হবে তা স্পষ্ট করেন। Reification ধারণা যা থেকে স্মিথ reified শব্দটি ব্যবহার করেছেন, আমরা এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনায় আসব।
‘ধার্মিকদের’ চিন্তা ও কর্মের ভিন্নতা নিয়ে তিন ধরনের ধার্মিকদের বাস্তবতা আমরা একটু খেয়াল করে দেখলে নিজেদের অভিজ্ঞতা ও কমনসেন্স দিয়েও বুঝতে পারি। ফরাসি ইসলামতাত্ত্বিক, সুফি-গবেষক ও ধর্মতত্ত্ববিদ Louis Massignon (1883–1962) মুসলমানদের তিনটি প্রবণতায় ভাগ করেন: (১) Mystics/Sufis—যাদের ধর্ম ঈশ্বরানুসন্ধানমূলক এবং অন্তর্মুখী, (২) Legalists/Traditionalists—যারা শরিয়া ও প্রথার ধারায় ধর্ম মেনে চলে, এবং (৩) Puritanical/Revivalists—যারা সংস্কার বা শুদ্ধতার নামে আক্ষরিক ও কট্টর ব্যাখ্যা দেয়। পরবর্তী পর্যায়ে ফজলুর রহমান Fazlur (১৯৬০-৭০ দশক) মুসলমানদের Neo-Revivalists vs Rational Reformers এই দুই ভাগে বিভাজন করেন। আর্নেস্ট গেলনার (Ernest Gellner) মুসলমানদের ‘High Islam (Ulama-based) vs Lwo Islam (¸stical-popular)’ এই দুই ধরনের বিভাজন করেন (1981, Muslim Society)। বিখ্যাত কানাডিয়ান ধর্মতত্ত্ববিদ Wilfred Cantwell Smith ধার্মিকদের তিন ধারার মনোভঙ্গি ব্যাখ্যা করেন।
R Scott Appleby & Marty (Fundamentalism Project) মৌলবাদের একটি একাডেমিক শ্রেণিবিন্যাস তৈরি করেন যা বহু ধর্মের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। রফিক জাকারিয়া তাঁর বহুল পঠিত বই The Struggle Within Islam: The Conflict Between Religion and Politics (1988)-এ মুসলমানদের অভ্যন্তরে ধর্মীয় প্রবণতার একটি সুস্পষ্ট ত্রিমুখী শ্রেণিবিন্যাস দেন। তিনি মুসলিম ধার্মিকদের তিনভাগে ভাগ করেন: সেক্যুলারিস্ট, সুফী ও মৌলবাদী।
সেক্যুলার যারা উদারপন্থী: আধুনিকতা, যুক্তিবাদ ও ধর্মীয় ব্যাখ্যায় বুদ্ধিবৃত্তিক প্রয়োগে বিশ্বাসী। একদিকে নামাজ রোজা করেন, অন্যদিকে সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের উপর গুরুত্ব দেন। মৌলবাদী: যারা কোরআন-হাদিসের আক্ষরিক ব্যাখ্যা ও ইসলামি রাষ্ট্র কায়েমে আগ্রহী। ঐতিহ্যগত ধর্মীয় অনুশাসন, গ্রন্থ ও প্রতিষ্ঠানকে অপরিবর্তনীয় ও চূড়ান্ত সত্য হিসেবে মানেন। বিজ্ঞান, মুক্তচিন্তা বা সৃজনশীলতাঁকে ধর্মীয় বিশ্বাসের জন্য হুমকি হিসেবে দেখেন। মৌলবাদীর আল্লাহ হচ্ছে, সর্বশক্তিমান বিধানদাতা ও শাস্তিদাতা। মওদূদী, হাসান আল বান্না, খোমেনি, হিযবুত তাহরির—এই ধারার অনুসারী। সুফিবাদী: যারা ধর্মকে অন্তর্দৃষ্টিমূলক ও অভিজ্ঞতামূলক বিষয় হিসেবে গ্রহণ করেন। ব্যক্তিগত আধ্যাত্মিক অনুশীলনে বিশ্বাসী, এবং রাজনৈতিক ইসলাম থেকে দূরে থাকেন। এদের কাছে আল্লাহ হচ্ছে, প্রেম, ঐক্য ও আত্ম-উৎসর্গের পরম প্রতীক। যেমন: রুমি, আল-হাল্লাজ, বুল্লে শাহ, শাহ আবদুল করিম প্রমুখের সাধনা।
নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষেত্রে এই তিন ধরনের মুসলমানের পার্থক্য স্পষ্ট। সেক্যুলার মুসলমানের দৃষ্টিভঙ্গি: ব্যক্তিস্বাধীনতা, পছন্দের অধিকার। নারীর দেহ তার নিজস্ব; রাষ্ট্র, সমাজ বা ধর্ম তার ওপর কর্তৃত্ব করতে পারে না। উদার মানবতাবাদ, আধুনিকতা, নারীবাদ, মানবাধিকার। পোশাক নিয়ে নৈতিক নজরদারি অগ্রহণযোগ্য; নারীর সম্মতি মুখ্য। সূফী মুসলমানের দৃষ্টিভঙ্গি: বাহ্যিক আবরণ নয়, অন্তর শুদ্ধ রাখাই মুখ্য। নারীকে ‘শরীর’ না দেখে ‘রূহ’ হিসেবে দেখা—তাসাউফের ভিত্তি। মৌলবাদী মুসলমানের দৃষ্টিভঙ্গি: নারীর শরীর ‘ফিতনা’ বা বিপদের উৎস; তাকে ঢেকে রাখতে হবে। হিজাব, নিকাব, বোরকা—নির্দিষ্ট দৈহিক কাঠামো অনুযায়ী আবৃত পোশাক বাধ্যতামূলক। পশ্চিমা পোশাক, রঙিন পোশাক, অলংকার, সাজগোজ হারাম/নিষিদ্ধ বিবেচিত। নারীর শরীরকে যৌন উত্তেজনার উৎস হিসেবে চিহ্নিত করে, যা মূলত একটি যৌনবাদী দৃষ্টিভঙ্গি ‘ধর্মের’ মোড়কে।
চ) মৌলবাদ, ধর্ম, বস্তুসত্ত্বায়ন ও ভাষার রাজনীতি: একটি মার্কসবাদী বিশ্লেষণ
প্রথমেই উল্লেখ করা জরুরি, মার্কসবাদী বিশ্লেষণ একটি সমাজবৈজ্ঞানিক পদ্ধতি, যা ব্যক্তির ধর্মীয় অবস্থান ও আচরণকে তার শ্রেণি, সামাজিক প্রেক্ষাপট, রাজনৈতিক ইতিহাস এবং সাংস্কৃতিক বাস্তবতার আলোকে বুঝতে চায়। এই বিশ্লেষণ কাঠামো বুঝতে দুইটি গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক ধারণা উপলব্দি থাকা দরকার: Reification (বস্তুসত্ত্বায়ন) এবং Anthropomorphizing (মনুষ্যীকরণ)। এই দুই ধারণা পরস্পর-সম্পর্কিত এবং ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক।
বিমূর্ত ধারণার বস্তুসত্ত্বায়ন বা Reification বলতে বোঝায় কোনো বিমূর্ত, গতিশীল ও আন্তঃব্যক্তিক ধারণাকে একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও ধ্রুব বস্তু হিসেবে কল্পনা করা। এটি একটি ভাষাগত ও মানসিক বিভ্রান্তি, যার মাধ্যমে আমরা বাস্তবতাকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করি। উদাহরণস্বরূপ, Wilfred Cantwell Smith দেখান যে ‘religion’ মূলত একটি মানবিক ও ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা; কিন্তু কিছু একাডেমিয়া ও মৌলবাদীরা এই ধারণাটিকে এমনভাবে উপস্থাপন করে যেন ধর্ম একটি স্বতন্ত্র, অপরিবর্তনীয় সত্তা যার একটি নির্দিষ্ট সীমানা, নিয়ম ও চেতনা রয়েছে।
বস্তুসত্ত্বায়ণ প্রক্রিয়া মৌলবাদীদের বক্তব্যে বিশেষভাবে লক্ষণীয়: যেমন—‘ইসলাম বলে নারীকে পর্দা করতে হবে’ কিংবা ‘ইসলাম শিক্ষা দেয় যুদ্ধ (জিহাদ) পবিত্র’। এখানে ‘ইসলাম’-কে এমন এক সত্তা হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, যেন এটি নিজে কথা বলে, সিদ্ধান্ত নেয় এবং নিজস্ব অভিপ্রায় প্রকাশ করে। অথচ বাস্তবে ‘ইসলাম’ একটি সাংস্কৃতিকভাবে গঠিত, বিভিন্ন মুসলমানদের ভিন্নভিন্ন ব্যাখ্যার সমষ্টি; এটি ঐতিহাসিক পরিবর্তন ও প্রাতিষ্ঠানিক শক্তির ফলাফল।
মার্কসের ‘commodity fetishism’ ধারণায় এই reification-এর মৌলিক ভিত্তি পাওয়া যায়, যেখানে পুঁজিবাদী সমাজে মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ককে পণ্যের মধ্যকার সম্পর্ক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। তাঁর ভাষায়: ‘A definite social relation between men... assumes, in their eyes, the fantastic form of a relation between things.’ (মার্কস, Capital: Volume I)
এখানে জুতা, জামা বা মোবাইল ফোন শুধু বস্তু নয়; এগুলোর পেছনে শ্রম, শোষণ ও সামাজিক সম্পর্ক থাকে। কিন্তু বাজারে এসব সম্পর্ক অদৃশ্য হয় বস্তুগুলো যেন নিজস্ব ‘মূল্য’ বা ‘শক্তি’ নিয়ে হাজির হয়। এই প্রক্রিয়া ধর্মের ক্ষেত্রেও ঘটে, যখন ধর্মীয় মত বা অনুশীলনকে ইতিহাস-সচেতন পরিবর্তনশীল ব্যাখ্যা হিসেবে না দেখে চিরন্তন ‘সত্য’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়।
Georg Lukács, Adorno ও Axel Honneth এই ধারণাটিকে বিস্তৃত করেন। লুকাস দেখান যে Reification কেবল বস্তু নয়, চিন্তাকেও ‘জড়বস্তু’ হিসেবে উপস্থাপন করে। Adorno-এর মতে, এটি আধুনিক যুক্তিবাদের অন্তর্নিহিত ব্যর্থতা—যেখানে ব্যক্তি হারিয়ে যায়, এবং বেঁচে থাকে কেবল পরিমাপযোগ্য বস্তু। Axel Honneth একে স্বীকৃতির (recognition) অভাব হিসেবে দেখেন, যেখানে মানুষকে আর অনুভূতিশীল ব্যক্তি হিসেবে দেখা হয় না, বরং একটি কার্যকর ‘বস্তু’ হিসেবে দেখা হয়।
মৌলবাদীরা ধর্মকে এইভাবেই ‘reified’ করে তোলে: ধর্ম আর একটি বিতর্কযোগ্য অভিজ্ঞতা থাকে না, বরং হয়ে ওঠে চিরন্তন, নিরপেক্ষ এবং প্রশ্নাতীত ‘সত্য’। এর ফলে, কোরআনের ব্যাখ্যাগত ভিন্নতা, সাংস্কৃতিক পার্থক্য, ও ঐতিহাসিক পরিবর্তনের স্থান সংকুচিত হয়ে যায়। ধর্মের মনুষ্যীকরণ বা Anthropomorphizing হচ্ছে Reification প্রক্রিয়ারই একটি ভাষাগত কৌশল যার মাধ্যমে একটি বিমূর্ত বা অজীব ধারণাকে মানবিক বৈশিষ্ট্য—যেমন চিন্তা, ভাষণ, অভিপ্রায়, ইচ্ছা—প্রদান করা হয়। মৌলবাদীরা এই কৌশলের মাধ্যমে তিনটি কাজ করে:
ব্যাখ্যাকারী গোষ্ঠী আড়াল হয়ে যায়—ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যে ব্যাখ্যা দিচ্ছে, তা যেন ‘ধর্ম’-এর নিজস্ব বক্তব্য।
ধর্মীয় কর্তৃত্ববাদ প্রতিষ্ঠিত হয়—‘আল্লাহ বলেছেন’ বলা হয়, যার ফলে মতামত ধর্মীয় বৈধতা পায়।
বিকল্প ব্যাখ্যার পথ রুদ্ধ হয়—যারা ভিন্ন ব্যাখ্যা দিতে চায়, তাদের প্রশ্ন করা হয়: ‘তুমি কি করে ধর্মের বিরুদ্ধে বলছ?’
এইভাবে Anthropomorphizing ধর্মকে এমন একটি সচেতন Actor হিসেবে গড়ে তোলে যার বক্তব্য চূড়ান্ত ও প্রশ্নাতীত। এটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে অত্যন্ত কার্যকর কারণ, তখন ক্ষমতাকে ধর্মীয় বৈধতা দেওয়া যায়, এবং প্রতিপক্ষকে ‘ধর্মবিরোধী’ ঘোষণা করে নির্মূল করা যায়।
মার্কসবাদী বিশ্লেষণে Reification এবং Anthropomorphizing কেবল ভাষাগত বিভ্রান্তি নয়; বরং এগুলো হচ্ছে ক্ষমতা গঠনের মাধ্যম। ধর্মকে যখন একটি একক, চিরন্তন সত্তা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তখন তার রাজনৈতিক ব্যবহার সহজ হয়। কারণ মানুষ তখন আর প্রশ্ন করে না, ব্যাখ্যা চায় না, ভিন্ন মত খোঁজে না। এই প্রক্রিয়ায় ব্যক্তি, ইতিহাস ও সামাজিক পরিবর্তন অদৃশ্য হয়ে যায়। ফলে, ধর্মের নামে যা বলা হয়, তা আসলে নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মত, অথচ উপস্থাপন করা হয় চূড়ান্ত ‘সত্য’ হিসেবে। ভাষা ও জ্ঞানের এই ক্ষমতানির্ভর নির্মাণকে উন্মোচনের জন্য Critical Discourse Analysis গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার—যা দেখায়, কীভাবে ‘ধর্ম’, ‘জাতি’, বা ‘রাষ্ট্র’ নামক ধারণাগুলোকে সামাজিক, ভাষাগত ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় নির্মাণ করা হয়।
৬. ঐতিহ্যের বাছাইকৃত পুনরুদ্ধার: মৌলবাদ এবং তালাল আসাদের Formations of the Secular
‘My concern is not to justify Islamism, but to understand how secular liberal norms define the scope of acceptable religiosity.’—Talal Asad, Interview, 2009
‘আমার ভাবনা ইসলামবাদকে ন্যায্যতা দেওয়া নয়, বরং বোঝার চেষ্টা যে ধর্মনিরপেক্ষ উদারনীতি কীভাবে গ্রহণযোগ্য ধর্মীয়তার পরিধিকে সংজ্ঞায়িত করে।’ এই বক্তব্যে তালাল আসাদ স্পষ্ট করে বলেন যে তাঁর উদ্দেশ্য ইসলামিজম তথা রাজনৈতিক ইসলাম বা মৌলবাদ সমর্থন করা নয়, বরং সেক্যুলার ক্ষমতা ধর্মকে কিভাবে সীমাবদ্ধ করে, তা উন্মোচন করা। একই সঙ্গে তালাল আসাদ বলতে বাধ্য হন যে তিনি মৌলবাদকে ‘বৈধতা’ দিতে চাননি। অর্থাৎ তাঁর এই সমালোচনা রয়েছে যে তিনি রাজনৈতিক ইসলাম, মৌলবাদ তথা ধর্মীয় সহিংসতাকে বৈধতা দিয়েছেন।
তাঁর বিরুদ্ধে মৌলবাদকে ও মৌলবাদী সন্ত্রাসকে বৈধতা দেয়ার অভিযোগ কেন? প্রশ্নটিকে অন্যভাবে করা যায়, যেমন তাঁর লেখায় এমন কি আছে যে কারণে তা মৌলবাদী সহিংসতাকে বৈধতা দেয়ার কাজে ব্যবহার করা যায়, যদিও তিনি সচেতনভাবে মৌলবাদী সহিংসতাকে বৈধতা দিতে চান না?
তালাল আসাদের তাত্ত্বিক অবস্থান সম্পর্কে বিশ্লেষণের আগে, মৌলিকভাবে আমরা কিছু প্রশ্নের মীমাংসা করে নিতে পারি। প্রথম প্রশ্ন, তালাল আসাদ কি ইসলামি মৌলবাদ সমর্থন করেন? উত্তর হলো সরাসরি ‘না’। তাঁর তত্ত্ব কি ইসলামপন্থীরা ব্যবহার করতে পারে? উত্তর হলো ‘হ্যাঁ’। তবে বাছাইকৃত ব্যবহার, প্রেক্ষিত পাল্টে। তিনি কাকে চ্যালেঞ্জ করেন? তার ভাষায় পশ্চিমা সেক্যুলারিজম, ধর্মীয় ব্যক্তিস্বাধীনতার ধারণাকে এবং তিনি নৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে ধর্মীয় ঐতিহ্যকে বিকল্পভাবে বোঝার পক্ষে।
তালাল আসাদের সঙ্গে ধর্মীয় মৌলবাদের দৃষ্টিভঙ্গির একটি ‘ভাষাগত’ মিল আছে। সেক্যুলারিজম সমালোচনায় ‘ইসলাম ও পশ্চিমের’ সম্পর্ক বিবেচনায়, ইসলামকে একটি ‘ঐতিহ্য’ হিসেবে বর্ণনায়, এবং উদারনৈতিক ‘মানবাধিকার’ সম্পর্কিত ধারণায়।
ধর্মীয় মৌলবাদের এক অন্যতম প্রধান কৌশল হলো ঐতিহ্যের একটি বাছাইকৃত পুনরুদ্ধার, যার মাধ্যমে অতীতের নির্দিষ্ট অনুষঙ্গ, অনুশীলন কিংবা অনুবাদের ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে বর্তমান রাজনীতিকে ধর্মীয় ভাষ্য ও আইনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা। এই ধারাটি ইসলাম ধর্মে বিশেষভাবে লক্ষণীয়, যেখানে ‘দ্বীন’—শুধু একটি ধর্মীয় বিশ্বাস নয় বরং একটি জীবনব্যবস্থা, আইন, সভ্যতা ও রাজনৈতিক আদর্শ হিসেবে উপস্থাপিত হয়। মৌলবাদী এই ধারাটি হচ্ছে তথাকথিত ‘রাজনৈতিক ইসলাম’ বা ইসলামিজমের রাজনৈতিক প্রকল্প।
এই বাস্তবতায় তালাল আসাদ, এডওয়ার্ড সাইদের চিন্তার উত্তরসূরি হিসেবে, ‘ধর্ম’ ও ‘সেক্যুলারিজম’ এর তাত্ত্বিক নির্মাণ ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করেন। তাঁর Formations of the Secular (2003) গ্রন্থে তিনি দেখান, কীভাবে ‘সেক্যুলার’ ধারণাটি একাধারে আধুনিকতার প্রকল্প এবং ক্ষমতার ভাষ্য হিসেবে কাজ করে। তিনি যুক্তি দেন যে, পশ্চিমা সেক্যুলারিজম কেবল ধর্ম থেকে রাষ্ট্রের বিচ্ছিন্নতা নয়, বরং একটি নৈতিক ও সাংস্কৃতিক রূপান্তরের প্রকল্প, যার মাধ্যমে ধর্মীয় অভিব্যক্তি ও আচরণ নিয়ন্ত্রিত হয়।
তালাল আসাদ পশ্চিমা সেক্যুলার ধারণাকে নিউট্রাল বা ইউনিভার্সাল বলে মানতে রাজি নন। তাঁর মতে, সেক্যুলারিজমের উৎস ইউরোপীয় ইতিহাসে, বিশেষত খ্রিস্টধর্ম ও রাষ্ট্রের মধ্যকার সংঘর্ষে নিহিত। ফলে, এই বিশেষ ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা অন্য সমাজে হুবহু প্রযোজ্য নয়। ইসলামের ক্ষেত্রে ‘ধর্ম’ কেবল একটি ব্যক্তিগত বিশ্বাস নয়; বরং তা একটি ন্যায়িক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে সংযুক্ত। এই ব্যতিক্রমী ধর্মতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক গঠনের স্বীকৃতি না দিয়ে ইসলামি সমাজকে সেক্যুলার মানদণ্ডে বিচার করা, পশ্চিমা আধিপত্যবাদী ভাষ্যকে বহন করে। ঠিক এখানেই মৌলবাদীরা তালাল আসাদের সঙ্গে ঐকমত্য পোষণ করে তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতার বুদ্ধিবৃত্তিক বৈধতা পেয়ে যান, তালাল আসাদকে ব্যবহার করতে পারেন।
তালাল আসাদের আলোচনায় সালমান রুশদির The Satanic Verses নিয়ে বিতর্ক একটি বিশিষ্ট স্থান দখল করে আছে। তাঁর The Rushdie Affair: The Novel, the Ayatollah, and the West (1993) গ্রন্থে তিনি দেখান, কিভাবে ‘ব্লাসফেমি’ বা ধর্মনিন্দা এবং ‘ফ্রিডম অফ স্পিচ’ এর মধ্যকার উত্তেজনা কেবল মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্ন নয়; বরং একটি সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের প্রতিফলন।
তিনি যুক্তি দেন, ইসলামি সমাজে নবী মুহাম্মদের প্রতি ভালবাসা ও শ্রদ্ধাবোধ কেবল ধর্মীয় আবেগ নয়, বরং একটি সামাজিক আত্মপরিচয়ের কেন্দ্র। সুতরাং, এই অনুভূতিতে আঘাত মানে গোটা সম্প্রদায়ের আত্মমর্যাদায় আঘাত। পশ্চিমা বাক-স্বাধীনতার ধারণা, যেখানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সর্বোচ্চ নীতি, সেখানে এই ধর্মীয় অনুভূতিকে অবজ্ঞা করার প্রবণতা দেখা যায়। এই ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির সংঘাতকেই আসাদ সিভিলাইজেশনাল ইনকম্প্যাটিবিলিটি বা সভ্যতাগত অসামঞ্জস্য হিসেবে না দেখে, রাজনৈতিক ও ইতিহাসগতভাবে নির্মিত দ্বন্দ্ব হিসেবে চিহ্নিত করেন। এখানে আমরা হান্টিংটনের সঙ্গে তালাল আসাদের মিল পাই, এবং একই সঙ্গে মৌলবাদীদের রাজনীতির বুদ্ধিবৃত্তিক বৈধতা পাই।
তালাল আসাদের তাত্ত্বিক কাঠামো অনুসারে, ধর্মের নামে প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার যে পুনঃপ্রতিষ্ঠা যেমন ইসলামকে রাষ্ট্রীয় আইন ও সামাজিক বিধিবদ্ধতার আধার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার প্রচেষ্টা—তা মূলত একটি ‘সেক্যুলার রেজিম’-এর প্রতিক্রিয়ায় তৈরি প্রতিসংস্কৃতি। মৌলবাদীরা এখানে কেবল ধর্মীয় অনুশাসনের অনুসারী নয়, বরং আধুনিক রাষ্ট্র ও জাতির কাঠামোর মধ্যেই নিজেদের রাজনৈতিক প্রকল্প গড়ে তোলে।
এই প্রেক্ষিতে, ইসলামি মৌলবাদীরা ‘ঐতিহ্য’ পুনরুদ্ধারের দাবি তোলেন, কিন্তু সেটা কখনওই কোনো পূর্ণাঙ্গ ঐতিহাসিক ধারার পুনরাবিষ্কার নয়; বরং একটি খণ্ডিত ও বাছাইকৃত ঐতিহ্যের প্রতিরূপ, যার উদ্দেশ্য হলো রাজনৈতিক আধিপত্য। তালাল আসাদ এই প্রবণতাকে ধর্মের ভেতরকার আন্তরিক বিশ্বাসের অভিজ্ঞতা (faith) থেকে সরে গিয়ে ধর্মকে একটি আধিপত্যবাদী সাংগঠনিক কাঠামোতে রূপান্তর বলে ব্যাখ্যা করেন।
তালাল আসাদের চিন্তার ব্যাপ্তি ও প্রভাব বোঝা যায় ভারতীয় সমাজবিজ্ঞানী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের একটি পর্যবেক্ষণ থেকে। তিনি লিখেছেন, ‘রুশদি বিতর্কে তালাল আসাদ শুধু রুশদির সমালোচনা করেননি; বরং পশ্চিমা রাষ্ট্র ও বুদ্ধিজীবী শ্রেণির মুসলিম অভিবাসীদের প্রতি সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিরও তীব্র সমালোচনা করেছিলেন।’ পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের মন্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তিনিও ইসলামি মৌলবাদকে ‘অনাধুনিক গোঁড়ামি’ হিসেবে চিহ্নিত করেন—যা শব্দের রাজনীতির আরেকটি উদাহরণ। এখানে ‘অনাধুনিক’, ‘গোঁড়া’, ‘সাম্প্রদায়িক’ ইত্যাদি শব্দ কেবল বর্ণনামূলক নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট ক্ষমতাবিন্যাস ও সাংস্কৃতিক অবস্থান প্রতিফলিত করে।
তালাল আসাদের চিন্তা ধর্ম ও আধুনিকতা, সেক্যুলারিজম ও মৌলবাদের দ্বন্দ্বকে যেভাবে ব্যাখ্যা করে, তা তাঁর আলোচনায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে ধর্ম কেবল একটি বিশ্বাস ব্যবস্থা নয়; বরং এটি ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর অন্তর্গত। তালাল আসাদের মতে ইসলামের মধ্যে ঐতিহ্যগতভাবে ধর্ম ও রাষ্ট্র পরস্পরবদ্ধ এক কাঠামো গঠিত করেছে। এই ধর্মতাত্ত্বিক বিন্যাসে ধর্মীয় কর্তৃত্ব এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা প্রায়শই সমান্তরালভাবে কাজ করে। সুতরাং, সালমান রুশদির বিরুদ্ধে আয়াতোল্লা খোমেনির ফতোয়াকে শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় রায় হিসেবে নয়, বরং রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার একটি রাজনৈতিক কর্ম হিসেবে পাঠ করা যায়।
তালাল আসাদের লেখা একাডেমিক ও জটিল। তাঁর লেখার একটি তাত্ত্বিক কাঠামো (Theoretical Framework) আছে। সেটি বুঝলে, তালাল আসাদের ধর্ম ও সেক্যুলারিজম নিয়ে সমালোচনা বোঝা সহজ হয়। তালাল আসাদের তাত্ত্বিক কাঠামো হচ্ছে সাংস্কৃতিক আপেক্ষিকতাবাদ (Cultural Relativism)।
তালাল আসাদ তাঁর বিশ্লেষণে যে সাংস্কৃতিক আপেক্ষিকতার (Cultural Relativism) পক্ষে সওয়াল করেন, তার একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো সালমান রুশদি বিতর্ক। পশ্চিমা বুদ্ধিজীবীরা খোমেনির ফতোয়াকে যেভাবে ‘ধর্মীয় মৌলবাদ’ এবং ‘অসহিষ্ণুতা’র নিদর্শন হিসেবে উপস্থাপন করেন, আসাদ সেই বিচারবোধের সার্বজনীনতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁর মতে, ইসলাম একটি স্বতন্ত্র ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় গঠিত সভ্যতা, যার নিজস্ব নৈতিক কাঠামো এবং কর্তৃত্ববোধ রয়েছে। সেই প্রেক্ষিতে ফতোয়াটিকে মৌলবাদ হিসেবে না দেখে, তাকে একপ্রকার সাংস্কৃতিক প্রতিক্রিয়া, আত্মপরিচয়ের প্রকাশ এবং কর্তৃত্বের অভ্যন্তরীণ যুক্তির প্রকাশ হিসেবে বোঝা উচিত।
আসাদের এই পাঠের ভিত্তি হলো, পশ্চিমা ধারণা—যেমন ব্যক্তি স্বাধীনতা, বাকস্বাধীনতা কিংবা মানবাধিকার সবসময় সার্বজনীন নয়; বরং সেগুলোও একটি নির্দিষ্ট ইতিহাস ও আদর্শিক পরিপ্রেক্ষিত থেকে গঠিত। তাই খোমেনির ফতোয়া কিংবা ইসলামিক নৈতিক প্রতিক্রিয়াকে বিচার করতে হলে, সেটিকে ইসলামি ন্যায়বিচার ও সাংস্কৃতিক অভ্যন্তর থেকে বোঝা জরুরি। এই যে সাংস্কৃতিক আপেক্ষিকতাবাদ এর সমস্যা কি?
ক) সাংস্কৃতিক আপেক্ষিকতাবাদের তাত্ত্বিক সংকট ও মৌলবাদের সম্পর্ক
তালাল আসাদের ‘সাংস্কৃতিক আপেক্ষিকতা’ বা প্রেক্ষিতভিত্তিক বিশ্লেষণ পদ্ধতি সমাজবিজ্ঞানের একটি পদ্ধতি, তবে এই পদ্ধতির তাত্ত্বিক ও নৈতিক সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে যথেষ্ট আলোচনা হয়েছে। মৌলবাদী সহিংসতাকে বৈধতা দেওয়ার বা পাওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা এই ‘সাংস্কতিক আপেক্ষিকতাবাদ’ পদ্ধতির। আত্মগতভাবে তালাল আসাদ মৌলবাদ বা রাজনৈতিক ইসলামকে বিরোধিতাও করতে পারেন, কিন্তু তাঁর এই সাংস্কতিক আপেক্ষিকতাবাদী পদ্ধতি যে বিশ্লেষণ উপস্থাপন করে, তা মৌলবাদের পক্ষে বৈধতা উৎপাদন করে।
প্রথমত, কোনো ঘটনার বিশ্লেষণে ওই সমাজের প্রেক্ষিত বিবেচনা করা জরুরি হলেও, সেই প্রেক্ষিতের কুশীলবদের দৃষ্টিভঙ্গিকেই ‘সত্য’ হিসেবে মেনে নেয়া আপত্তিকর। উদাহরণস্বরূপ, রুশদির বিরুদ্ধে আয়াতোল্লা খোমেনির ফতোয়াকে যদি ‘ইসলামিক ঐতিহ্যের’ ব্যাখ্যা হিসেবে গ্রহণ করে সমর্থন দেওয়া হয়, তবে তা সার্বজনীন মানবাধিকার ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এ অবস্থান একটি সাংস্কৃতিক নৈতিক আপেক্ষিকতার চূড়ান্ত প্রকাশ, যা প্রায়শই স্থানীয় নিপীড়ন ও বঞ্চনাকে বৈধতা দেয়।
দ্বিতীয়ত, সাংস্কৃতিক আপেক্ষিকতাবাদের সমস্যাটি এখানে যে এটি শোষণ ও বৈষম্যের বাস্তবতাকে ‘ঐতিহ্য’ বা ‘সংস্কৃতি’ নামে রক্ষা করার সুযোগ দেয়। উদাহরণ হিসেবে, শিশুকন্যার জেনিটাল মিউটিলেশন বা নারী খৎনা (FGM)-এর মতো মানবাধিকারের স্পষ্ট লঙ্ঘনকেও কেউ কেউ ‘ঐতিহ্য’ হিসেবে রক্ষা করতে চান, এই যুক্তিতে যে এর বিরুদ্ধে অবস্থান ‘পশ্চিমা হস্তক্ষেপ’।
তৃতীয়ত, সাংস্কৃতিক পার্থক্য সত্ত্বেও কিছু মৌলিক মূল্যবোধ যেমন মানব মর্যাদা, সহমর্মিতা, ন্যায়বিচারসব সমাজেই বিদ্যমান থাকে। এগুলোর বহিঃপ্রকাশ রূপগতভাবে ভিন্ন হলেও, অন্তর্বস্তু বা মৌলিক তাৎপর্যে একধরনের সার্বজনীনতা থাকে। সাংস্কৃতিক আপেক্ষিকতাবাদ এই সার্বজনীনতা অস্বীকার করে একটি আত্মবিচ্ছিন্নতা ও বিভাজন তৈরি করে।
তালাল আসাদের বিশ্লেষণের কেন্দ্রে যে সাংস্কৃতিক আপেক্ষিকতাবাদ, যা ধারণা করে যে, প্রতিটি বিশ্বাস ও অনুশীলনকে তার নিজস্ব সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে মূল্যায়ন করতে হবে। আপাতদৃষ্টিতে এই ধারণা মুক্তচিন্তার অনুরূপ মনে হলেও, এর সমস্যাও কোথায় তা পাঠকের কাছে অজানা থেকে যায় যদি পাঠক সাংস্কৃতিক আপেক্ষিকতার সমস্যাগুলো অনুধাবন না করেন। মৌলিক ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারের সার্বজনীন মূল্যবোধের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েও তিনি সহজেই তালাল আসাদের মতের সঙ্গে একমত হতে পারেন। যেমন উপরে উদাহরণ দেয়া হয়েছে যে ধর্মীয় অনুশীলনের নামে নারী অধিকার লঙ্ঘন বা শিশুর দেহে আঘাতকারী প্রথাগুলোর সমালোচনা করলে তা ‘পশ্চিমা আধিপত্যবাদ’ বলে প্রত্যাখ্যান করা যায়। অথচ মানবাধিকার একটি নির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক ধারা নয়, বরং একটি ন্যায়বিচারভিত্তিক সার্বজনীন নীতি। এখানেই মৌলবাদীরা তালাল আসাদকে ব্যবহার করতে পারেন, মৌলবাদের রাজনৈতিক ক্ষমতাকে বৈধতা দেওয়ার কাজে। মৌলবাদের যুক্তিভিত্তি দাঁড়িয়ে যায় আমেরিকান একাডেমিয়ার ‘জ্ঞানের’ ওপর যা ‘পশ্চিমা’ শিক্ষায় শিক্ষিত ‘মুসলমান’ তরুণদের রাজনৈতিক মগজধোলাইয়ে অধিক কার্যকর, কোনো ঐতিহাসিক ‘হাদিসের’ ‘জ্ঞানের’ তুলনায়।
খ) ধর্ম ও ধার্মিকতা: তালাল আসাদের ‘ইসলাম’ চূড়ান্ত বিচারে মৌলবাদীদের অবস্থানকে বৈধতা দেয়।
তালাল আসাদের ইসলাম-সংক্রান্ত চিন্তা একটি আদর্শিক অবস্থানকে ধারণ করে। যেকোনো তাত্ত্বিক ভাষ্যই কিছু নির্দিষ্ট মতাদর্শিক ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে থাকে। যেমন: ধর্মীয় পুনরুত্থানবাদ, সংস্কৃতি-জাতীয়তাবাদ, বা নয়া-ঔপনিবেশিকতা-বিরোধী রাজনৈতিক প্রান্তিকতা। এই প্রেক্ষিতে প্রশ্ন জাগে, তালাল আসাদের আলোচনায় ইসলাম কি নিছক একটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, না কি একটি রাজনীতিকরণকৃত পরিচিতি যা মৌলবাদী ও ইসলামি জাতীয়তাবাদী এজেন্ডাকে তাত্ত্বিক বৈধতা প্রদান করতে পারে?
ইসলামকে ‘ঐতিহ্য’ হিসেবে উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে তালাল আসাদ কি ‘ইসলাম’কে ধর্মের বদলে একটি রাজনৈতিক প্রকল্পে রূপান্তর করতে বৌদ্ধিক সহায়তা করছেন? অর্থাৎ, তাঁর ‘ইসলাম’-চিন্তা কি ধর্মকে একটি আধ্যাত্মিক অভ্যন্তর থেকে বিচ্যুত করে সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী রাজনীতির হাতিয়ারে পরিণত করছে? এটি যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষত যখন বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতিতে ইসলাম-জাতীয়তাবাদ ও রাজনৈতিক ইসলামের উত্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যে মৌলবাদ তথা ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের উত্থান লক্ষ করা যায়—যা একদিকে পশ্চিমা আধিপত্যবাদবিরোধী এবং অন্যদিকে একটি সংস্কৃতি-কেন্দ্রিক ইসলামি পরিচয় নির্মাণে সচেষ্ট—তার তাত্ত্বিক ব্যাকরণ নির্মাণে তালাল আসাদের চিন্তা কি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে? বিশেষত, তাঁর রচনায় ধর্ম, রাজনীতি এবং আধুনিকতা যে আন্তঃসম্পর্কে ধরা পড়ে, তা বর্তমানকালের ইসলামি রাজনৈতিক আন্দোলনকে ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।
তাত্ত্বিকভাবে ‘রিলিজিয়াস’ ধারণাটির মধ্যেই অন্তর্ভুক্ত থাকে তিনটি প্রধান ধারা—মৌলবাদী, সেক্যুলার এবং আধ্যাত্মবাদী। অর্থাৎ, ‘রিলিজিয়াস’ শব্দটি শুধুমাত্র ঐতিহ্যবাদী বা আনুষ্ঠানিক ধার্মিকতার সংকেত নয়; বরং এর ভেতরে রয়েছে পরস্পরবিরোধী অভ্যন্তরীণ ধারা। ফলে, ‘রিলিজিয়াস’ ধারণাটির প্রকৃত প্রতিসংস্থান ‘এথিস্ট’—‘সেক্যুলার’ নয়। কিন্তু তালাল আসাদ তাঁর শ্রেণিবিন্যাসে ধার্মিক ও সেক্যুলারের মধ্যে এক ধরনের অস্পষ্ট দ্বৈততা তৈরি করেন, যা রাজনৈতিক মৌলবাদীদের পক্ষে একটি বৌদ্ধিক বৈধতা তৈরি করে।
তালাল আসাদের পাঠে পাঠক প্রায়শই তথ্য ও ব্যাখ্যার ভিন্নতা বোঝার ক্ষেত্রে বিভ্রান্ত হন। তাঁর উপস্থাপিত তথ্য প্রায়শই নির্ভুল ও গুরুত্বপূর্ণ হলেও, সেসব তথ্যের ওপর গঠিত ব্যাখ্যা অনেকক্ষেত্রে বিতর্কিত এবং প্রশ্নাতীত নয়। ফলে পাঠককে তথ্য গ্রহণ করতে হলেও ব্যাখ্যার সঙ্গে সতর্ক দূরত্ব বজায় রাখতে হয়, যা পাঠে ধৈর্য ও বিশ্লেষণী দৃষ্টিভঙ্গির দাবি তোলে। তাঁর লেখনীতে বক্তব্য বিন্যাস প্রায়শই অনিশ্চিত ও স্ববিরোধী। একাধিক স্তরে প্রশ্ন তৈরি হয়—এই দ্বন্দ্বটি কি ধর্ম বনাম বিজ্ঞান? না কি ধার্মিক বনাম নাস্তিক? না কি পশ্চিম বনাম ইসলাম? না কি ঔপনিবেশিক শক্তি বনাম উপনিবেশিত সমাজ? এই প্রশ্নগুলোর নির্দিষ্ট ও সুস্পষ্ট উত্তর তিনি দেন না। ফলে পাঠকের সুবিধামতো কিছু উদ্ধৃতি টেনে নিয়ে পশ্চিমবিরোধী, সেক্যুলারবিরোধী এবং মৌলবাদপন্থী বক্তব্য তৈরি করাও সহজ হয়ে পড়ে।
গ) সেক্যুলারিজম সম্পর্কে সাংস্কৃতিক আপেক্ষিকতাবাদী ধারণা: পার্থক্য ও মিলের জায়গা কোথায়?
তালাল আসাদের Formations of the Secular: Christianity, Islam, Modernity (2003) গ্রন্থে উপস্থাপিত কয়েকটি মূল তত্ত্বগত অবস্থান নিচে পর্যালোচনা করা হলো, যা একদিকে ‘সেক্যুলারিজম’ সম্পর্কে তাঁর অবস্থান স্পষ্ট করে, অন্যদিকে রাজনৈতিক ও মতাদর্শিক প্রশ্নের সম্মুখীন হয়:
সেক্যুলারিজম একটি নিরপেক্ষ বা সার্বজনীন নীতি নয়: এটি একটি ঐতিহাসিকভাবে নির্দিষ্ট ইউরোপীয় সাংস্কৃতিক প্রকল্প, যার জন্ম রিফরমেশন, এনলাইমেন্ট বা আলোকায়ন ও আধুনিক জাতিরাষ্ট্রের আবির্ভাবের প্রেক্ষিতে। এর ফলেই ধর্মকে ‘ব্যক্তিগত’ ও অ-রাজনৈতিক চর্চায় রূপান্তর করা হয়েছে, যা ইসলাম বা হিন্দুধর্মের মতো পরম্পরাগত ধর্মব্যবস্থার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
পশ্চিমা ধর্ম ও সেক্যুলারিজমের পার্থক্য খ্রিস্টীয় ঐতিহ্যনির্ভর: এই মডেল বিশ্বজনীন নয়, বরং ইসলামিক বা হিন্দু সমাজে ধর্ম ও রাজনীতি গভীরভাবে আন্তঃসম্পর্কিত। ফলে সেক্যুলারিজম ভিন্ন সমাজে ভিন্নভাবে উদ্ভাসিত হয়।
সেক্যুলারিজমও একটি ক্ষমতার কাঠামো: এটি ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ নামে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের একটি প্রণালী, যা ধর্মকে আইনি কাঠামো দ্বারা সীমিত করে এবং রাষ্ট্রকে ধর্মের রূপ নির্ধারণের অধিকার দেয়।
সেক্যুলারিজম নিজেই একটি নতুন ধর্মীয় কাঠামো: আসাদের মতে, সেক্যুলারিজমে রয়েছে নিজস্ব আচার, বিশ্বাস ও নীতির কাঠামো, যা ব্যক্তি ও সমাজকে নির্দেশ করে ধর্মের ‘উপযুক্ত’ চেহারা কী হবে। এভাবে এটি নতুন এক প্রকারের ‘ধর্মীয় কর্তৃত্ব’ হয়ে দাঁড়ায়।
ঔপনিবেশিক চাপ হিসেবে সেক্যুলারিজম: যেহেতু এটি ইউরোপীয় আবিষ্কার ও ঔপনিবেশিক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত, তাই এটি অ-পশ্চিমা সমাজে অনুপযুক্ত ও সংঘর্ষপূর্ণ হয়ে ওঠে—বিশেষ করে যেসব সমাজে ধর্ম ও রাজনীতি বিভাজ্য নয়।
সেক্যুলারিজমের একচেটিয়া চরিত্র: বহুত্ববাদ বা প্লুরালিজমের দাবির বিপরীতে, এটি ইউরোপীয় মডেলকেই একমাত্র বৈধ হিসেবে চাপিয়ে দেয় অন্য সমাজে, যা মতাদর্শিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে।
তালাল আসাদের সেক্যুলারিজম বিষয়ক উপরের ৬টি প্রতিপাদ্য দ্বান্দ্বিকভাবে পাঠযোগ্য। একদিকে এটি পশ্চিমা আধুনিকতা ও ঔপনিবেশিক ক্ষমতার সমালোচনা, অন্যদিকে এটি প্রাচ্যে ধর্মীয় মৌলবাদ, উগ্র জাতীয়তাবাদ এবং বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের মধ্যে এক নতুন তাত্ত্বিক বৈধতা সৃষ্টি করে। পশ্চিমা শিক্ষাব্যবস্থা ও বুদ্ধিজীবী পরিসরে অবস্থান করেও, আসাদ তাঁর লেখায় পশ্চিমের আধিপত্যশীল জ্ঞানের কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করেছেন—যা তাঁকে নয়া-বাম, উত্তর-আধুনিক এবং উত্তর-উপনিবেশবাদী চিন্তকদের ধারায় স্থান দেয়। তবে এ-ও লক্ষ্যণীয় যে তাঁর ‘পশ্চিম’ সমালোচনা, ভাষিক ও তাত্ত্বিক কাঠামোতে, প্রাচ্যের ইসলামিক মৌলবাদ ও বর্ণবাদবিরোধী বামপন্থী রাজনীতির জন্যও কার্যকর হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।
সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক হচ্ছে তালাল আসাদের ৪ নম্বর প্রতিপাদ্য, যা সেক্যুলারিজম যা চার্চের ক্ষমতার বিপক্ষে দাঁড়িয়ে ‘ইহজাগতিকতা’, বিজ্ঞান চিন্তা, ব্যক্তির চিন্তা ও বিশ্বাসের প্রকাশের আন্দোলন যা ‘ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারের’ বিপক্ষে, সেই সেক্যুলারিজম ধারণাটিকে একটি ‘ধর্ম’ (Faith) বানিয়ে দেয়। তালাল আসাদের নাম লেখা না থাকলে যে কেউ তাঁকে রাজনৈতিক ইসলাম অ্যাপোলজিটিক বা একজন মৌলবাদীর লেখা হিসেবে বিবেচনা করতে পারে।
এটা ঠিক, ইউরোপে ও ভারতীয় উপমহাদেশে ‘সেক্যুলারিজম’ ধারণার উদ্ভব ঘটেছে দুই ঐতিহাসিক সময়ে ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে। কিন্তু দুই অঞ্চলের পার্থক্য যেমন আছে, তেমন মিলও আছে।
ইউরোপে সেক্যুলারিজমের উদ্ভব ঘটেছিল চার্চের কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র ও নাগরিক জীবনের স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে। মধ্যযুগীয় ক্যাথলিক চার্চের অসীম ক্ষমতা ও ধর্মীয় কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করে রেনেসাঁ ও প্রোটেস্ট্যান্ট রিফর্মেশন আন্দোলন তৈরি করে এক বুদ্ধিবাদী ও মানবকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি, যার পটভূমিতে গড়ে ওঠে আধুনিক রাষ্ট্র ও শিল্পপুঁজিবাদ। এখানে সেক্যুলারিজম মানে ছিল রাষ্ট্রীয় কাঠামো থেকে ধর্মীয় কর্তৃত্বকে প্রত্যাহার করে ব্যক্তিস্বাধীনতা, যুক্তিবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষ আইন প্রতিষ্ঠা। অর্থাৎ, এটি ছিল মূলত চার্চের বিরুদ্ধে নাগরিক ও রাষ্ট্রীয় আধিপত্যের প্রতিষ্ঠা, যেখানে ধর্মকে ব্যক্তিগত বিশ্বাসের পরিসরে সীমাবদ্ধ রাখাই ছিল মূল লক্ষ্য।
ভারতীয় উপমহাদেশে সেক্যুলারিজম এসেছে ভিন্ন এক ঐতিহাসিক ও ঔপনিবেশিক প্রেক্ষিতে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন ‘কমিউনাল এওয়ার্ড’ ও ‘ডিভাইড এন্ড রুল’ নীতির মাধ্যমে ধর্মীয় বিভাজনকে রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত করে। এর বিরুদ্ধে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন জাতীয়তাবাদ আন্দোলনে ধর্মনিরপেক্ষতা ছিল একটি কৌশলগত ঐক্যের ভাষা, যা হিন্দু-মুসলিমসহ নানা ধর্মীয় সম্প্রদায়কে একত্রে ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রামে যুক্ত করার প্রয়াসে ব্যবহৃত হয়। এখানে সেক্যুলারিজমের অর্থ ছিল রাষ্ট্রীয় নিরপেক্ষতা নয় বরং বহুধর্মীয় সমাজে সাম্প্রদায়িক সংহতির রাজনৈতিক দাবি। ইউরোপ ও ভারতের সেক্যুলারিজমের উদ্ভবের পথ আলাদা হলেও একটি জায়গায় মিল রয়েছে—উভয় ক্ষেত্রেই ‘ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারের’ বিরুদ্ধে এক প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে সেক্যুলারিজম বিকশিত হয়েছে।
ঘ) ‘ধর্ম’ বা ‘ইসলাম’ ধারণায় তালাল আসাদের মৌলিক বিভ্রান্তি বস্তুসত্ত্বাকরণ (Reification)
তালাল আসাদ তাঁর নন্দনতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক আপেক্ষিকতামূলক (Cultural Relativist) দৃষ্টিভঙ্গিতে ইসলামকে একটি ‘ঐতিহ্যগত অনুশীলন’ (Discursive Tradition) হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে, ইসলাম কোনো নির্দিষ্ট নীতির তালিকা বা গোষ্ঠীগত আচরণের সারাংশ নয়, বরং এটি এক দীর্ঘ ঐতিহাসিক ধারায় গড়ে ওঠা এবং নির্দিষ্ট কর্তব্য-আচরণ, ব্যাখ্যা, ও চর্চার মধ্য দিয়ে পুনর্গঠিত একটি জ্ঞানভিত্তিক ঐতিহ্য। এ ব্যাখ্যা একদিকে পাশ্চাত্য প্রগতিশীল ও প্রাচ্যতত্ত্বমূলক দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিচিন্তা তৈরি করে, কিন্তু অন্যদিকে সমালোচকদের মতে, আসাদ এখানে ইসলামকে একটি ‘বস্তু’ (Reified Entity) হিসেবে কল্পনা করেন, যেন এটি নিজস্ব অভিপ্রায় ও লক্ষ্যসম্পন্ন এক বাস্তবিক সত্তা।
এই সমালোচনার কেন্দ্রে রয়েছে দুটি মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গি: Reification ও Anthropomorphizing। Reification অর্থাৎ ‘পুনর্বস্তুয়ীকরণ’ বোঝায়, যখন কোনো বিমূর্ত ধারণাকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যেন সেটি একটি স্বাধীন, স্থির ও আত্মনির্ভর বস্তু। তালাল আসাদের আলোচনায় ইসলামকে কখনও কখনও এমন একটি ঐতিহ্যগত কাঠামো হিসেবে দেখা হয়, যা সমাজ ও রাজনীতির প্রেক্ষাপটে নিজেই নিজেকে রক্ষা বা বিকশিত করার ক্ষমতা রাখে। ফলে, ইসলামকে একটি অভিন্ন ও কার্যক্ষম সত্তা হিসেবে তুলে ধরা হয়, যদিও বাস্তবে এটি একটি বহুমাত্রিক, বিতর্কপূর্ণ, এবং নানা সামাজিক-রাজনৈতিক শক্তির মধ্যকার নিরন্তর দ্বন্দ্ব ও বিকাশপ্রবণ চর্চা। একইভাবে, Anthropomorphizing বোঝায় যখন একটি বিমূর্ত ধারণাকে মানবসুলভ গুণাবলী (ইচ্ছা, সচেতনতা, অভিপ্রায়) প্রদান করা হয়। সমালোচকদের মতে, আসাদ ইসলামকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করেন যেন এটি একটি আত্মসচেতন ঐতিহ্য যা নিজস্ব ব্যাখ্যা ও প্রতিক্রিয়া তৈরি করে; এই anthropomorphic কৌশল ইসলামকে একটি সমাজবিচ্ছিন্ন, প্রায় জীবন্ত সত্তায় পরিণত করে, যা ধর্মীয় অভিজ্ঞতার জটিলতা ও বৈচিত্র্যকে অবজ্ঞা করে।
এই ভ্রান্তিগুলো ধর্মকে সাংস্কৃতিক পরিসরের গতিশীল দ্বান্দ্বিকতার বদলে এক প্রায়-স্বয়ংসম্পূর্ণ ‘ঐতিহ্য’ হিসেবে স্থির করে ফেলে, যেখানে ইসলাম একটি অদ্বিতীয় কাঠামো হিসেবে কাজ করে, বরং ধর্মীয় অভিজ্ঞতা ও অনুশীলনের বৈচিত্র্য, দ্বন্দ্ব, ক্ষমতার রাজনীতি ও ইতিহাসে এর ভিন্ন ব্যাখ্যার স্থান সংকুচিত হয়। সুতরাং, আসাদের ‘ইসলাম’ ব্যাখ্যার নন্দনতাত্ত্বিক শক্তি থাকা সত্ত্বেও তার মধ্যে একটি সীমাবদ্ধতা থেকে যায়—যেখানে ধর্মকে জীবনপ্রবাহের পরিবর্তনশীল, রূপান্তরশীল ও দ্বন্দ্বময় গঠনের বদলে এক অনুপযুক্ত আত্মসত্তা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
উপসংহার
তালাল আসাদের ‘ইসলাম’-কে একটি ঐতিহ্যগত অনুশীলন (Discursive Tradition) হিসেবে উপস্থাপন করার যে পদ্ধতি, তা ধর্মকে একটি অন্তর্নিহিত, ধারাবাহিক, এবং অভ্যন্তরীণ যুক্তিসম্পন্ন কাঠামো হিসেবে তুলে ধরে। এই ব্যাখ্যা রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ মনে হলেও, এটি মৌলবাদ বা রাজনৈতিক ইসলামের পক্ষে একটি পরোক্ষ বৌদ্ধিক বৈধতা (Intellectual Legitimation) তৈরি করে—যা সমালোচকদের মতে, গুরুতর এক সমস্যা।
প্রথমত, যখন আসাদ ইসলামকে এক ঐতিহাসিক ধারাবাহিক ঐতিহ্য হিসেবে দেখেন, তিনি এই ধারার মধ্যকার দ্বন্দ্ব, বিচ্যুতি, বিকল্প ব্যাখ্যা বা রূপান্তরকে বরং ওই ঐতিহ্যের ‘ভিতরের’ অংশ হিসেবেই গ্রহণ করেন। ফলে, আধুনিক রাজনৈতিক ইসলাম—যেমন: সালাফিবাদ, জামায়াতে ইসলামি, বা মুসলিম ব্রাদারহুডের মত সংগঠনগুলো নিজেদের দাবি করতে পারে এই ঐতিহ্যের বৈধ উত্তরসূরি হিসেবে। তারা বলতে পারে, ‘আমরাই ইসলামি ঐতিহ্যকে আধুনিক যুগে টিকিয়ে রাখছি’। আসাদের এই কাঠামোয় তাদের অবস্থানকে এক ধরনের ধর্মীয় ধারাবাহিকতার ভেতর বসানো সম্ভব হয়, যা তাঁদের আদর্শিক অবস্থানকে ঐতিহাসিক জ্ঞানের মধ্যে গেঁথে দেয়, এমনকি তা যতই র্যাডিক্যাল বা সহিংস হোক না কেন।
দ্বিতীয়ত, আসাদের বিশ্লেষণে ধর্মীয় অনুশীলন ও জ্ঞানের উৎপাদন একেবারে ‘ভেতরের’ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ব্যাখ্যা করা হয়, যা বহিরাগত সমালোচনার প্রতি আপাত অনীহা প্রকাশ করে। এই অবস্থান রাজনৈতিক ইসলামের নীতিনির্ধারকদের পক্ষে উপকারী, কারণ তারা নিজেদের ব্যাখ্যা ও আইন (শরিয়াহ) প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ‘পশ্চিমা আধুনিকতা’ বা ‘সেক্যুলার অনুপ্রবেশ’ বিরোধিতার মাধ্যমে নিজেদের নৈতিক উচ্চভূমিতে দাঁড় করাতে পারে। এক্ষেত্রে আসাদের পোস্ট-সাম্রাজ্যবাদী অবস্থান—যা পশ্চিমা জ্ঞান ও ক্ষমতার কাঠামোকে প্রশ্ন করে—তা মৌলবাদী শক্তিরও কাজে আসে, যারা একইভাবে ‘অথেনটিক ইসলাম’ ফিরিয়ে আনার নামে গণতন্ত্র, নারীবাদ বা মানবাধিকারের মতো আধুনিক ধারণাগুলোর বিরোধিতা করে।
এইভাবে, তালাল আসাদের ব্যাখ্যা একটি একাডেমিক স্তরে দাঁড়িয়ে ধর্মীয় অনুশীলনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জটিলতা তুলে ধরলেও, এর অন্তর্নিহিত নৈতিক নিরপেক্ষতা ও ঐতিহ্য-কেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি এমন রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে সুবিধা দেয় যারা ঐতিহ্যকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে আধুনিক রাষ্ট্র কাঠামো দখলের চেষ্টা চালায়। সুতরাং, আসাদের মডেল একদিকে প্রাচ্যতত্ত্বকে প্রশ্ন করলেও, অপরদিকে তা মৌলবাদী ‘অন্তর্জাত ইসলাম’ দাবিদারদের একটি নতুন সাংস্কৃতিক ও জ্ঞানগত আশ্রয় প্রদান করে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্মীয় পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতি এবং মৌলবাদী ইসলামি রাজনীতি এমন এক কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, যা বিদ্যমান শোষণমূলক শ্রেণিকাঠামোর রক্ষণাবেক্ষণে কার্যকর ভূমিকা রাখে। একটি মার্কসবাদী বিশ্লেষণ স্পষ্ট করে যে এই ধরনের কৌশলসমূহ জনগণের বাস্তব শ্রেণিস্বার্থ, ঐক্য এবং মুক্তির সংগ্রামকে বাধাগ্রস্ত করে। তাই বিকল্প রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্মাণের জন্য শ্রেণিচেতনার পুনর্গঠন এবং ধর্মীয় ও জাতিগত পরিচয়ের সীমা অতিক্রম করে বাস্তব জীবনের সংগ্রামের ভিত্তিতে ঐক্য গড়ে তোলা অপরিহার্য।
রাজনৈতিক ইসলামের তাত্ত্বিক উৎস ও মতাদর্শগত কাঠামো বিশ্লেষণের সময় প্রায়শ ইসলাম ধর্ম, কোরআন বা হাদিসের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করা হয়। তবে মৌলবাদকে কেবল একটি ‘ধর্মীয়’ ইস্যু হিসেবে না দেখে একটি ‘সামাজিক-রাজনৈতিক’ প্রপঞ্চ হিসেবে বোঝা জরুরি। এর বিকাশে সহায়ক হয়েছে নানা ধরনের রাজনৈতিক শক্তি, রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়া এবং বুদ্ধিবৃত্তিক হস্তক্ষেপ। সেই অর্থে একাডেমিক পরিসরে এমন লেখালেখি ও তাত্ত্বিক অবস্থান চিহ্নিত করা গুরুত্বপূর্ণ, যেগুলো সরাসরি না হলেও পরোক্ষভাবে মৌলবাদের পক্ষে যুক্তি সরবরাহ করে বা তার জন্য নৈতিক ও সাংস্কৃতিক বৈধতা তৈরি করে।
বর্তমানে বহু শিক্ষিত মুসলমান মৌলবাদী কোরআন বা হাদিসের ব্যাখ্যার মাধ্যমে নয়, বরং পশ্চিমা একাডেমিক বৃত্তের ভাষা ও তাত্ত্বিক কাঠামোর মাধ্যমে নিজেদের রাজনৈতিক ইসলামকে বৈধতা দিতে চায়। তালাল আসাদের মতো চিন্তাবিদদের অনেক সময় এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়, যেন তিনি সেক্যুলারিজম-বিরোধী অবস্থান নিয়ে মৌলবাদের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছেন। যখন একটি সুস্পষ্ট সাম্যবাদী বা বিকল্প প্রগতিশীল রাজনৈতিক কল্পনা অনুপস্থিত থাকে, কিন্তু সমসাময়িক সাম্রাজ্যবাদ বা উদারনীতির সমালোচনা করা হয়—তখন এই সমালোচনার ভাষা চরম ডানপন্থী ইসলামোফ্যাসিস্ট রাজনীতির পক্ষে সহজেই ব্যবহৃত হতে পারে। এই ঝুঁকি বোঝা এবং তা মোকাবিলা করা প্রগতিশীল তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক কর্মীদের জন্য এক জরুরি চ্যালেঞ্জ।
তথ্যসূত্র:
Nandz, A., 1998. Time Warps: Silent and Evasive Pasts in Indian Politics and Religion. New Brunswick : Rutgers University Press.
Bhargava, R., 2010. The Promise of IndiaÕs Secular Democracy. Oxford: Oxford University Press.
Chandra, B., 1989. Communalism in Modern India. New Delhi: Vikas Publishing House.
Jalal, A. (1994). The Sole Spokesman: Jinnah, the Muslim League and the Demand for Pakistan. Cambridge University Press.
Nasr, V. (1996). Mawdudi and the Making of Islamic Revivalism. Oxford University Press.
Government of Pakistan (1954). Report of the Court of Inquiry constituted under Pun‡jvab Act II of 1954 to Enquire into the Pun‡jvab Disturbances of 1953 (Munir Report). Lahore: Government Printing.
Afary, J., & Anderson, K. B. (2005). Foucault and the Iranian Revolution: Gender and the Seductions of Islamism. University of Chicago Press.
Coll, S. (2004). Ghost Wars: The Secret History of the CIA, Afghanistan, and Bin Laden. Penguin Press.
Kepel, G. (2002). Jihad: The Trail of Political Islam. Harvard University Press.
Fuïuama, F. (1992). The End of History and the Last Man. Free Press.
Huntington, S. P. (1993). ‘The Clash of Civilizations?’ Foreign Affairs, 72(3), 22–49.
Said, E. W. (2001). The Clash of Ignorance. The Nation.
Sen, A. (2006). Identity and Violence: The Illusion of Destiû. W. W. Norton.
Chomsï, N. (2001). 9-11. Seven Stories Press.
Marty, M. E., & Appleby, R. S. (Eds.). (1991–2004). The Fundamentalism Project (Vols. 1–5). University of Chicago Press.
Dawkins, R., 2006. The God Delusion. London: Bantam Press.
Harris, S., 2004. The End of Faith: Religion, Terror, and the Future of Reason. New York: W.W. Norton.
Hitchens, C., 2007. God is Not Great: How Religion Poisons Everything. New York: Twelve.
Dennett, D.C., 2006. Breaking the Spell: Religion as a Natural Phenomenon. New York: Viking.
Marty, M.E. & Appleby, R.S., 1991. The Fundamentalism Project. Chicago: University of Chicago Press.
Smith, W.C., 1962. The Meaning and End of Religion. New York: Macmillan.
Huntington, S. P. (1996). The Clash of Civiliæations and the Remaking of World Order. Simon & Schuster.
Wittgenstein, L. (1953). Philosophical Investigations.
Durkheim, É. (1912). The Elementary Forms of Religious Life.
Marx, K., 1844. Critique of Hegel’s Philosophy of Right.
Eagleton, T., 2009. Reason, Faith, and Revolution: Reflections on the God Debate. Yale University Press.
Žižek, S., 2009. Violence: Six Sideways Reflections. Picador.
Marty, M.E. & Appleby, R.S., 1991. The Fundamentalism Project. University of Chicago Press.
Geerty, C., 1973. The Interpretation of Cultures. Basic Books.
Berger, P., 1967. The Sacred Canopy: Elements of a Sociological Theory of Religion. Anchor Books.
Chatterjee, Partha. The Nation and Its Fragments: Colonial and Postcolonial Histories. Princeton University Press, 1993.
Dirks, Nicholas. Castes of Mind: Colonialism and the Making of Modern India. Princeton University Press, 2001.
Jalal, Ayesha. The Sole Spokesman: Jinnah, the Muslim League and the Demand for Pakistan. Cambridge University Press, 1995.
Pandey, Gyanendra. The Construction of Communalism in Colonial North India. Oxford University Press, 1990.
Nussbaum, Martha C. The Clash Within: Democracy, Religious Violence, and India’s Future. Harvard University Press, 2007.
Asad, T., 2003. Formations of the Secular: Christianity, Islam, Modernity. Stanford University Press.



মন্তব্য