পোস্ট-কলোনিয়ালিজম তত্ত্বের ভ্রান্ত অভিলাষ
বিগত কয়েক দশকে উত্তর উপনিবেশিক তত্ত্ব বা পোস্ট-কলোনিয়াল থিয়োরি (Post Colonial Theory) বুদ্ধিজীবী মহলে বেশ দাপটের সঙ্গে প্রভাব বিস্তার করে আছে। দেশি-বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বুদ্ধিবৃত্তি চর্চার প্রাধান্যশীল ধারা এখন এই পোস্ট-কলোনিয়াল স্টাডি। একাডেমিক গণ্ডি অতিক্রম করে এটি এখন গণমাধ্যম, সুশীল সমাজ, ঘোষিত বিপ্লবী—সর্বত্র মূলধারার মতবাদে পরিণত হয়েছে। ইউরোপ আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে এখন পোস্ট-কলোনিয়াল স্টাডি সংক্রান্ত গ্রাজুয়েট কোর্স ও রিসার্স ইউনিট চালু রয়েছে। শুধু যুক্তরাজ্যেই বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রীক ১৪টি পোস্ট-কলোনিয়াল স্টাডি গবেষণা কেন্দ্র এখন বিদ্যমান এবং এ সংক্রান্ত ১২টি মাস্টার্স কোর্স চালু আছে। এছাড়াও বিশ্বের প্রায় ২০টি নামকরা একাডেমিক জার্নালে পোস্ট-কলোনিয়াল বিষয়ক লেখা নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে।
শুরুতে পোস্ট-কলোনিয়াল তত্ত্বের আত্মপ্রকাশ ঘটে সাহিত্য ও সংস্কৃতির তত্ত্ব (Post Colonial Literary Theory) রূপে। পাশ্চাত্যের বাইরে অ-পাশ্চাত্য বা তৃতীয় বিশ্বের সাহিত্যকে প্রান্তিকতায় ছুঁড়ে ফেলার প্রতিবাদী আন্দোলন হিসেবে তা যাত্রা শুরু করে। ব্রিটিশ রাজকীয় (Imperial) সাহিত্য সংক্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গির সমালোচনায় মুখর হয় তা। উল্লেখ্য যে উপনিবেশবাদ থেকে মুক্ত হবার কালে অধীনস্থ ও মুক্তিপ্রাপ্ত দেশগুলির অনেকে ইংরেজী ভাষায় সাহিত্য রচনা করে। যেমন: আর কে নারায়ণ, চিনুয়া আচিবে, মুলকরাজ আনন্দ, ভি এস নাইপল। ‘কমনওয়েলথ লিটারেচার’ নামে এই ধারা পরিচিতি লাভ করে পঞ্চাশের দশকে। ১৯৬৪ সালে কমনওয়েলথ সাহিত্য সম্মেলনে এভাবে তৃতীয় বিশ্বের লেখকরা স্বীকৃতি পায়। কমনওয়েলথ লিটারেচার জার্নালে তৃতীয় বিশ্বের লেখকদের লেখা প্রকাশিত হয়। কিন্তু তখনও কেন্দ্র ও প্রান্তের ভেদাভেদ বজায় থাকায় তৃতীয় বিশ্বের সাহিত্যকে নিম্নমানের বলে বিবেচিত হতো। তাকে অভিনন্দন জানালেও, তা ছিল করুণা মিশ্রিত দয়া-দাক্ষিণ্যে ভরা। ক্রমশঃ সাহিত্য বিচারের ক্ষেত্রে কমনওয়েলথ লিটারেচার বা সাহিত্য বিচারের মানদণ্ড নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। তৃতীয় বিশ্বের নিজস্ব মানদণ্ডে সাহিত্যকে দেখার প্রচেষ্টা শুরু হয়। আর দ্রুতই এই নয়া প্রতিবাদী ধারা বেগবান ও শক্তিশালী হয়ে উঠে। ১৯৫২ সালে প্রকাশিত ফ্রান্সের উপনিবেশ আলজেরিয়ার লেখক ফ্রান্জ ফ্যাননের ‘Black Skin white Mask’ নামক বিখ্যাত বই এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। তিনি তাঁর এই গ্রন্থে দেখান—উপনিবেশিক শোষণ-শাসন কেবল অর্থনৈতিক লুণ্ঠন ও রাজনৈতিক পরাধীনতার পরিণতি বয়ে আনেনি, সেই সঙ্গে মানুষের আত্মবিশ্বাস কেড়ে নিয়ে তাকে হীনমন্য ও পরনির্ভরশীল করে তুলেছে। তাদের মনোজাগতিক দাসে পরিণত করেছে। এভাবেই প্রতিবাদ প্রতিরোধের ধারায় পোস্ট-কলোনিয়াল থিওরি বা পোস্ট-কলোনিয়ান স্টাডির সূত্রপাত হয়। পরবর্তীকালে ১৯৭৮ সালে এডওয়ার্ড সাঈদের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘ওরিয়েন্টালিজম’ এক্ষেত্রে বিস্ফোরণ ঘটায়—পোস্ট-কলোনিয়াল বা উত্তর উপনিবেশিক তত্ত্বের ভিত্তিপ্রস্তর স্থান করে। এখানে তিনি পাশ্চাত্য তার উপনিবেশিক শোষণ-শাসনের স্বার্থে প্রাচ্যকে বিকৃতভাবে নির্মাণ করার যে ‘সাংস্কৃতিক রণকৌশল’ প্রয়োগ করেছে, তার স্বরূপ তুলে ধরেন। যেখানে পাশ্চাত্যের কাছে প্রাচ্য হল—হীন, অজ্ঞ, অসভ্য, পশ্চাদপদ, বর্বর, রুচিহীন, কুসংস্কারাচ্ছন্ন এবং রহস্যময়। তাই প্রাচ্যকে সভ্য করার দায়-দায়িত্ব হল পাশ্চাত্যের অর্থাৎ শ্বেতাঙ্গদের। আর এভাবে প্রাচ্যের মানুষের জ্ঞান, চেতনা, সংস্কৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করে পাশ্চাত্য। এই নয়া উত্তর উপনিবেশিক সাহিত্য-সংস্কৃতি তত্ত্বের প্রভাবে তৃতীয় বিশ্বের লেখকদের রচনা নানা উপেক্ষা অবজ্ঞা মোকাবেলা করে সামনে উঠে এবং Ngugi Wa Thiongo, Aime Cesaire, Salman Rushdie, G G Marques প্রমুখ লেখকদের সাহিত্যকর্ম ইউরোপ-আমেরিকার নামী-দামি বিশ্ববিদ্যালয়গুলির পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত হয়।
কিন্তু উপনিবেশবাদের এই সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদী ধারার প্রতিরোধী কণ্ঠস্বর রূপে যে পোস্ট-কলোনিয়াল তত্ত্বের যাত্রা শুরু, তা পরবর্তীতে দ্রুতই তার গতিপথ পরিবর্তন করে। সাংস্কৃতিক তত্ত্ব থেকে বিপ্লবী রাজনৈতিক তত্ত্ব হয়ে উঠার দিকে ধাবিত হয়। আর ক্রমশ তা নয়া বিকল্প বিপ্লবী তত্ত্বের দাবি নিয়ে মার্কসবাদের স্থান দখল করার তৎপরতা চালায়। সেই সঙ্গে এই উত্তর উপনিবেশিক তত্ত্ব দু’দিক থেকে মার্কসবাদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পরে। একদিকে তারা যুক্তি তুলে ধরে যে—মার্কসবাদ সেকেলে—তাকে হালনাগাদ করা দরকার, অন্যদিকে আবার প্রায়শই বা কখনো কখনো মার্কসবাদকে অপরাধীর কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। মার্কসবাদ এখন অপ্রাসঙ্গিক, অগ্রহণযোগ্য বিধায় তাকে বাতিল বলে ঘোষণা করে।
এখন প্রশ্ন হল—কেন ও কোন প্রেক্ষাপটে উত্তর উপনিবেশিক তত্ত্বের উদ্ভব ঘটলো? বস্তুত এই তত্ত্ব এসেছে ‘বিপ্লবী আশাবাদের’ অপমৃত্যু জনিত ‘পরাজিত মনোভাব’ থেকে। সমাজ বদলের বিপ্লবী তত্ত্ব মার্কসবাদের মত সমাজ বদলের লড়াইয়ের ময়দান থেকে এই তত্ত্ব উঠে আসেনি। উপনিবেশবাদ বিরোধী সংগ্রাম, সমাজ বদলের বিপ্লবী তত্ত্ব ও লড়াই এবং মার্কসবাদ থেকে কিছুটা প্রণোদনা পেয়েছে মাত্র। বরং একাডেমিক জগত ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অঙ্গন থেকে উত্তর উপনিবেশিক তত্ত্ব আবির্ভূত হয়েছে।
উল্লেখ্য যে ৬০ ও ৭০-এর দশক ছিল বিশ্বজুড়ে বিপ্লবী ও প্রগতিশীল আন্দোলনের এক উত্তাল সময়। ফ্রান্সের প্যারিসে ছাত্র-বিদ্রোহ, কিউবার বিপ্লব, ভিয়েতনামের গেরিলা যুদ্ধ, নারী আন্দোলনের ঢেউ, মার্কিন মুলুকে কৃষ্ণাঙ্গদের নাগরিক অধিকার আন্দোলন, ভিয়েতনাম যুদ্ধ বিরোধী বিক্ষোভ, লাতিন আমেরিকার বিপ্লবী লড়াই, শক্তিশালী শ্রমিক আন্দোলন, তৃতীয় বিশ্বে কমিউনিস্ট আন্দোলন—এসব ঘটনা মানুষের মনে নতুন দুনিয়ার স্বপ্নের বীজ বপন করে। সেই সঙ্গে মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে পাঠ্যসূচির প্রগতিশীল পরিবর্তন সহ সাধারণ ছাত্রদের জন্য উচ্চতর ডিগ্রি লাভের সুযোগ সম্প্রসারিত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে নানা সামাজিক আন্দোলন গড়ে। মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে উচ্চতর শিক্ষালাভের সুবাদে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলি থেকে উল্লেখযোগ্য হারে একাডেমিক জগতে ঠাই পাবার পথ খুলে যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চতর ডিগ্রি বিপুল বিত্তসহ সামাজিক প্রভাব-প্রতিপত্তির লাভের সোপান হয়ে উঠে। তাদের কাছে সমাজতন্ত্রের আকর্ষণ হ্রাস পায়। অন্যদিকে কাছাকাছি সময়ে ৮০-র দশকে পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদের মুক্তবাজার অভিমুখী বিশ্বায়নের কর্মকৌশল স্বরূপ উদার নীতিবাদের আক্রমণ যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে তীব্রতা লাভ করে। ফলে আগ্রাসী ও ঢালাও বিরাষ্ট্রীয়করণ, কল্যাণমূলক কর্মসূচিসহ রাষ্ট্রীয় খাত সংকোচন, ব্যবসা-বাণিজ্যের ভৌগলিক বাধা অপসারণ, পুঁজির অবাধ বিচরণ, বিজ্ঞান ও তথ্য প্রযুক্তিগত বিপ্লবের কারণে উৎপাদন ব্যবস্থার কাঠামোগত পরিবর্তন, উৎপাদনের বৈশ্বিক রূপান্তর, শ্রম আইনের শ্রমিকস্বার্থবিরোধী সংস্কার—এসব দ্রুত গতিতে চলতে থাকে দেশে দেশে। এর পরিণতিতে ইউরোপ আমেরিকায় রাষ্ট্রীয় আক্রমণের মুখে শ্রমিক আন্দোলন স্তিমিত হয়। তবে দ্রুতই আবার মুক্তবাজারমুখী পুঁজিবাদী বিশ্বায়ন দেশে দেশে জনগণের জীবন জীবিকাকে দুর্বিসহ করে তোলে এবং এবং এর বিরুদ্ধে মানুষের বিক্ষোভ আন্দোলন নানারূপে আত্মপ্রকাশ করে। এ অবস্থা বিপ্লবী তত্ত্ব ও বিপ্লবী আন্দোলন গড়ে তোলার দাবি জানালেও তা পূরণের প্রচেষ্টা সাময়িক সংকটে পরে।
যদিও এই সংকটের উদ্ভব ঘটে আরো আগে। রুশ বিপ্লবের পর সোভিয়েত ইউনিয়নে সমাজতান্ত্রিক বিনির্মাণ এবং মার্কসবাদ চর্চা নিয়ে পশ্চিম ইউরোপের মার্কসবাদী বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে অসন্তোষ ও সমালোচনা দেখা দেয়। এ প্রক্ষেপটে উদ্ভূত হয় পশ্চিমা মার্কসবাদ, ফ্রাংকফুট স্কুল ও তার ক্রিটিক্যাল থিয়োরি, ইপি থমসনের তলা থেকে ইতিহাস চর্চা বা হিস্ট্রি ফ্রম বিলো (History from Below) এবং পরবর্তীতে নয়া মার্কসবাদ, (Neo Marxism) উত্তর মার্কসবাদ (Post Marxism), সাংস্কৃতিক মার্কসবাদ (Cultural Marxism), ন্যায্যতাধর্মী মার্কসবাদ (Normative Marxism) ইত্যাদি নানা তত্ত্ব। একদিকে এই তত্ত্ব নির্মাতারা দু’একটি বিরল ব্যতিক্রম ছাড়া—সকলেই হলেন একাডেমিক জগতের। মার্কস-এঙ্গেলস-লেনিন-স্তালিন-গ্রামসি-মাও-এর মত কেউই একাধারে বিপ্লবী তত্ত্বকার এবং বিপ্লবী লড়াইয়ের নেতা নন। আর এভাবে বিপ্লবী তত্ত্ব ও তৎপরতার জগতে তাত্ত্বিক এবং প্রায়োগিকের মধ্যে অনাকাক্সিক্ষত বিচ্ছেদ ঘটে যায়। ফলে তারা বিদ্যমান সমাজতন্ত্র বিনির্মাণের কষ্টকর-প্রতিকূল-দূরহ-জটিলতাজনিত দুর্বলতাসহ ত্রুটি-সীমাবদ্ধতাকে উপলব্ধি করতে পারেননি। সমাজ বিপ্লবের ক্ষেত্রে তত্ত্ব ও প্রয়োগের সেতুবন্ধন যে প্রকৃতি বিজ্ঞানের অনুরূপ না, সমাজ বিজ্ঞানে প্রয়োগ যে তত্ত্বকে হুবহু যান্ত্রিকভাবে অনুসরণ করে না, বরং গৃহীত তত্ত্ব ও বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে যে ব্যবধান থাকে—তা তারা বিবেচনায় নেননি। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় তারা মার্কসবাদী বিপ্লবী তত্ত্ব ও প্রয়োগকে সমৃদ্ধ করতেও আগ্রহ দেখাননি। বরং তারা ‘বিশুদ্ধতার পুজারি’ হয়ে খাঁটি তত্ত্ব ও খাঁটি প্রয়োগের অন্বেষায় কাতর হয়েছেন। অবশেষে মার্কসবাদকেই নানাভাবে আক্রমণের লক্ষ্যে পরিণত করেছেন। পোস্ট স্ট্রাকচারলিজম থেকে পোস্টমর্ডানিজম এরই সর্বশেষ নিদর্শন। এসব তত্ত্বসম্ভার আসলে ‘বৈশ্বিক তত্ত্ব কারখানার’ উৎপাদ—যার আমেরিকাকরণ (Americanization) এখন সম্পন্ন হয়েছে। আর এসবের প্রভাব বুদ্ধিজীবী ও বিশ্ববিদ্যালয়সহ একাডেমিক জগতকে আচ্ছন্ন করে। সবশেষে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিপর্যয় তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে মানবমুক্তির আন্দোলনের কথা বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলনকে সাময়িক সংকটে ফেলে দেয়। মানুষের মনে সমাজতন্ত্রের স্বপ্ন ফিকে হয়ে আসে। একাডেমিক মহলেও সমাজতন্ত্রের প্রতি আকর্ষণ হ্রাস পায়। সর্বত্র যেন একটা পরাজিতের মনোভাব মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। আর এই সংকট থেমে জন্ম নেওয়া শূণ্যতা পূরণে এগিয়ে আসে পোস্ট-কলোনিয়াল তত্ত্ব। এর প্রবক্তা হয়ে উঠে মার্কসবাদের প্রতি দুর্বলভাবে সম্পর্কিত ও আস্থাশীল বামপন্থী বুদ্ধিজীবী এবং জ্ঞানতাত্ত্বিক বিশেষজ্ঞ হবার বাসনায় মার্কসবাদকে নিছক একটি জ্ঞান অর্জনের বিষয় রূপে গণ্য করা একাডেমিক মহল। এই নয়া তত্ত্ব ঘোষণা করে—দেশে দেশে মানবমুক্তির আন্দোলনের ব্যর্থতা মূলত মার্কবাদের তাত্ত্বিক সীমাবদ্ধতা ও দুর্বলতার পরিণতি। দুনিয়া এখন অনেক বদলে গেছে, বিশ্বজুড়ে পুঁজিবাদের সংকট এখন ঐতিহাসিক বস্তুবাদ দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। দরকার নয়া তত্ত্বের। নয়া তত্ত্বের অন্বেষায় তারা পুঁজিবাদবিরোধি সংগ্রামী ভূমিকা থেকে পিছু হটে। মানবমুক্তির জন্য লড়াইকে পরিত্যাগ করে। বিদ্যমান পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থা নিয়ে প্রাণবন্ত তর্ক-বিতর্ক এবং সমাজ বদলের লড়াইয়ে অংশগ্রহণের চাইতে তারা কেবল ভাষা, সংস্কৃতি ও প্রতিনিধিত্বের প্রচলিত ভাষ্যকে চ্যালেঞ্জ জানাতে আগ্রহী হয়ে পরে। ফলে ‘বিপ্লবী’ বলে দাবিদার এই তত্ত্ব বিপ্লবী অনুশীলনের জগৎ থেকে বিযুক্ত হয়ে একাডেমিক মহলের চৌহদ্দীতে ঢুকে পরে। এই তত্ত্বের কাছে সত্য কিংবা বস্তুগত বাস্তবতা বলে কিছু নেই, আছে কেবল লাগাতার ভাষ্য বা ডিসকোর্স, অভিজ্ঞতা ও মতামত। তাই এখন বাস্তব অবস্থা কিংবা সমাজ ব্যবস্থা বদলটা মূল কর্তব্য নয়, কেবল নিজের মনের বি-উপনিবেশীকরণ (Decolonizing mind) ঘটালেই চলবে। বস্তুত লড়াই নয়, অবসাদ ও হতাশার ভেতর থেকে পোস্ট-কলোনিয়াল তত্ত্বের জন্ম। স্বাভাবিকভাবেই এই তত্ত্ব তাই পোস্টমর্ডানিজম, আইডেনটিটি পলিটিক্স ও সাবঅলটার্ন স্টাডির অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে।
পোস্ট-কলোনিয়াল তত্ত্ব নিয়ে কথা বলার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ঝামেলা হল—এর জটিলতা ও দুর্বোধ্যতা। পোস্ট কলোনিয়ালিজম, পোস্ট-কলোনিয়াল ক্রিটিসিজম, পোস্ট-কলোনিয়াল থিওরি, পোস্ট-কলোনিয়াল হিস্ট্রি, পোস্ট-কলোনিয়াল স্টাডি—নানা নাম। উপরন্তু এটা কি এবং কখন—সেটাও কেউ নিশ্চিত নয়। পোস্ট কলোনিয়ালিজম-এর সঠিক অর্থ নিয়েও অস্বচ্ছতা ও মতভেদ রয়েছে। এর প্রবক্তারা তাদের তত্ত্বকে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরার বদলে অহেতুক দূরহতা ও পরিভাষার আশ্রয় নেন। ফলে গবেষণা করে একে বুঝতে হয়। কারণ সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস, দর্শন, নৃতত্ত্ব, রাজনীতি—সর্বত্রই তা বিস্তার লাভ করায় এর বোধগম্যতা দুষ্কর। এই তত্ত্বের প্রবক্তারা এমন বহুমুখী অর্থবোধক বাক্যবিন্যাসে তাদের বক্তব্য তুলে তুলে ধরেন—তা থেকে নানা সিদ্ধান্ত টানা যায়। ফলে যে কেউ এই তত্ত্বের কোনো সমালোচনা করলে, তারা সহজেই তা খণ্ডন করে যুক্তি দেখান যে, এখানে বক্তব্যের অন্য দিকের প্রতি নজর দেওয়া হয়নি কিংবা ভুল দিকে দৃষ্টিপাত করা হয়েছে।
বলা যায়—তত্ত্বের চাইতে এটি বিশ্লেষণী চিন্তার বা ক্রিটিক্যাল থিংকিংয়ের একটি জালিকা বিন্যাস। ঢিলেঢালাভাবে জড়ো হওয়া নানা ভাবনার সমাহার। এই তত্ত্বের কোনটা সমালোচনাযোগ্য সেটাও খুঁজে পাওয়া ভার। এর ভিত্তি রচনায় অবদান রেখেছে ইতালির কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা বিপ্লবী তত্ত্বকার আন্তোনিও গ্রামসী, উত্তর-আধুনিক চিন্তক মিশেল ফুকো, সাবঅলটার্ন স্টাডি গ্রুপ ও এডওয়ার্ড সাঈদের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘ওরিয়েন্টালিজম’।
এখানে উল্লেখ্য যে পোস্ট-কলোনিয়ালিজম (বা উত্তর-উপনিবেশবাদ) এর ‘পোস্ট’ (Post) বা ‘উত্তর’ কোনো সময়সীমার নির্দেশক নয়। অর্থাৎ এটা কেবল উপনিবেশবাদের বা কলোনিয়ালিজমের পরিসমাপ্তির পরবর্তী সময়কালকে বোঝায় না, বরং উপনিবেশ থেকে মুক্ত দেশগুলির রাজনীতি-অর্থনীতি সংস্কৃতিকে উপনিবেশবাদের দীর্ঘস্থায়ী ও অব্যাহত প্রভাবকেও তুলে ধরে।
উত্তর উপনিবেশিক তত্ত্ব সমাজবিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠিত পদ্ধতি ও যৌক্তিকতাকে চ্যালেঞ্জ জানায় কিন্তু এক্ষেত্রে নিজেরা কঠোর গবেষণা চালাতে ও বৈজ্ঞানিক জ্ঞান গড়ে তুলতে খুবই নগন্য আগ্রহ প্রদর্শন করে। তাদের সবচেয়ে মৌলিক দুর্বলতা হল—আদর্শগত পক্ষপাত, একপাক্ষিক অস্পষ্ট ধ্যান ধারণা, অভিজ্ঞতা-প্রসূত ও গবেষণাভিত্তিক প্রমাণের বদলে কাহিনী বা আখ্যানের প্রতি আকর্ষণ এবং বর্তমান কালের মূল সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রবণতাগুলিকে উপেক্ষা করা। উত্তর উপনিবেশিক দেশের বস্তুগত বাস্তবতা ও পুঁজিবাদী সম্পর্ককে অহেতুক ধোঁয়াটে রহস্যময় করে তোলা।
পোস্ট-কলোনিয়াল তত্ত্বের সবচেয়ে মৌলিক বৈশিষ্ট্য হল এনলাইটমেন্ট বা আলোকপ্রাপ্তি যুগের এবং তৎপরবর্তী কালের প্রতিষ্ঠিত স্বাধীনতা, মুক্তি, যুক্তিবাদ, বিজ্ঞানমনস্কতা, মানবাধিকার, ন্যায়বিচার, উদারনীতিবাদ, গণতন্ত্র, বস্তুনিষ্ঠতা—এসব ক্যাটাগরি বা প্রত্যয়গুলিকে প্রত্যাখান করা। তাদের দাবি মতে এসব ধারণা পাশ্চাত্য বা ইউরোপকেন্দ্রীক (Western And Eurocentric) বিধায় উপনিবেশ থেকে মুক্ত অ-ইউরোপীয় দেশগুলির ভিন্ন বৈচিত্রপূণ্য বাস্তবতাকে বোঝার ক্ষেত্রে অনুপযুক্ত এবং তাই পরিত্যাজ্য। এভাবে তারা পশ্চিম ও পূর্ব কিংবা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য অথবা উত্তর ও দক্ষিণের মধ্যকার পার্থক্যকে অস্তিত্বগত সত্য বা চিরস্থায়ী ভিন্নতা রূপে প্রতিষ্ঠিত করে। কারণ তাদের ব্যাখ্যায় ইউরোপ বা পশ্চিমা বিশ্বের তত্ত্ব-জ্ঞান-চিন্তা অ-ইউরোপীয় বিশ্বে বেমানান এবং তাদের উপর তা চাপিয়ে দেওয়া হবে নিজেদের প্রকৃত জ্ঞান-অভিজ্ঞতা-ইতিহাসকে অবজ্ঞা করা। উপরস্তু কোনো একটি সাধারণ অভিন্ন বৈশ্বিক কাঠামোতে পূর্ব ও পশ্চিম ভিন্নতাকে উপেক্ষা করে তাদের এক্ষেত্রে বুঝতে চাইলে আমরা ইউরোপ কেন্দ্রীকতার খপ্পরে পরতে বাধ্য।
কিন্তু পোস্ট-কলোনিয়াল তত্ত্বকারদের এই দাবির ন্যায্যতা ও যৌক্তিকতা কতটুকু! ইতিহাসগত, সংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ভিন্নতা কি আলোকপ্রাপ্তির যুগের আদর্শগুলির সার্বজনীনতাকে নাকোচ করে? আসল সত্য হল—শ্রেণি, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ, সংস্কৃতি ও অন্যান্য পার্থক্য নির্বিশেষে সব মানুষ একটি সাধারণ সার্বজনীন স্বার্থের অধীন। সেই সার্বজনীনতার উৎস ইউরোপ না এশিয়া—সেটা এক্ষেত্রে বিবেচ্য নয়। বরং এসব সার্বজনীন প্রত্যয় ন্যায্য, গ্রহণযোগ্য, নৈতিক কিনা—সেটাই বিচার্য হওয়া উচিৎ। তাছাড়া মানবিক আকাক্সক্ষাগুলি সাংস্কৃতিকভাবে নির্ধারিত হয় না, সাধারণ স্বার্থ ও মৌলিক প্রয়োজনের ভিত্তিতে সেসব গ্রহণযোগ্যতা ও ন্যায্যতা পায়। তবে নিশ্চয়ই যুগের প্রেক্ষিতে এসব সার্বজনীন প্রত্যয়ের ত্রুটি দুর্বলতা সীমাবদ্ধতা দেখা দেবে এবং তার যুগপোযোগী হালনাগাদ করতে হবে।
পাশ্চাত্য (West) ও অ-পাশ্চাত্য (East)-এ ধরনের মৌলিক বিভক্তি তুলে ধরে পোস্ট-কলোনিয়াল তত্ত্ব ‘তৃতীয় বিশ্ববাদের’ (Third worldism) প্রবক্ত হয়ে উঠে। কিন্তু এক্ষেত্রে তারা পুঁজিবাদ সাম্রাজ্যবাদ, শোষণ, শ্রেণি ও শ্রেণি সংগ্রাম—এসব এড়িয়ে গিয়ে নয়া উপনিবেশিক বিশ্বব্যবস্থাকে কেবল সাংস্কৃতিকভাবে সংজ্ঞায়িত করে। উন্নত, অগ্রসর, ধনী দেশ এবং সাবেক উপনিবেশিক দেশগুলির মধ্যকার উপনিবেশবাদ ও উত্তর উপনিবেশবাদী সম্পর্ককে এদের বস্তুগত চালিকাশক্তি দিয়ে নয় বরং মতাদর্শ, ডিসকোর্স, পরিচয়, সংস্কৃতি—শুধু এসব দিয়েই ব্যাখ্যা করতে চায়। ফলে তারা নিজেরাই এডওয়ার্ড সাঈদ কর্তৃক তীব্র আকারে সমালোচিত ‘প্রাচ্যবাদ’-এর ওরিয়েন্ট (প্রাচ্য) ও অক্সিডেন্টাল (পাশ্চাত্য)—এই বিভাজনের খপ্পড়ে পরেন নিজেদের অজান্তে। তারা বঞ্চিত নিপীড়িতদের পক্ষ নিতে চায় এবং তাদের মুক্তি ও ক্ষমতায়নের কথা বলে। কিন্তু এক্ষেত্রে তারা আবার সামাজিক বাস্তবতা ব্যাখ্যা ও বদল নয় বরং শুধু বর্ণনা করতে আগ্রহী। তারা শ্রেণি, শ্রেণিবিশ্লেষণ ও শ্রেণি সংগ্রামকে উপনিবেশ-বিরোধিতা (Anti-colonialism) দ্বারা স্থানচ্যুত করে। রাজনীতিকে স্বার্থ নয়, সংস্কৃতির উপর ভিত্তি করে দেখে। অথচ সংস্কৃতি ইচ্ছে স্থানিক ও সুনির্দিষ্ট কিন্তু বস্তুগত স্বার্থ সার্বজনীন। যেমন সর্বত্রই শোষিত নিপীড়িতরা মুক্তি চায়। এভাবে তারা আলোকপ্রাপ্তির যুগের অর্জনগুলিকে ও তার সার্বজনীনতাকে প্রত্যাখ্যান করে উত্তর-উপনিবেশিক ও অ-ইউরোপীয় দেশগুলির ধর্ম, সংস্কৃতি ও পশ্চাৎপদতাকে অতিরিক্ত মান্যতা দেয়। এরই ধারাবাহিকতায় পোস্ট-কলোনিয়াল তত্ত্বের আক্রমণ পরিচালিত হয় মার্কস ও মার্কসদের বিরুদ্ধে।
তাদের অভিযোগ হল: মার্কসের তত্ত্ব—পুঁজি, পুঁজিবাদ, শ্রেণি, শ্রেণিসংগ্রাম, সমাজতন্ত্র—এসব ইউরোপকেন্দ্রীক (Eurocentric) এবং উত্তর-উপনিবেশিক, অ-ইউরোপীয় দেশের ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের জন্য তা প্রয়োগযোগ্য নয়। পুঁজিবাদ যেহেতু ইউরোপে প্রথম উদ্ভূত হয়েছে। তাই পুঁজিবাদকে কেন্দ্র করে গড়ে মার্কসের তত্ত্ব ইউরোপকেন্দ্রীক হতে বাধ্য। তাছাড়া মার্কস নিজেও একজন ইউরোপীয়ান বা বৃদ্ধ শ্বেতাঙ্গ। সেই সঙ্গে পোস্ট-কলোনিয়াল তত্ত্ব উপনিবেশবাদবিরোধী ও বিপ্লবী সংগ্রামের ক্ষেত্রে মার্কসবাদের তত্ত্বগত ও প্রয়োগিক অবদানকে উপেক্ষা করে। তাদের দাবি—মার্কসের পুঁজির বিশ্লেষণ ও যুক্তি অনুযায়ী পুঁজিবাদ ও তার উপযোগী রাজনৈতিক ব্যবস্থা এবং সম্মতিভিত্তিক আধিপত্যের মাধ্যমে বুর্জোয়া শ্রেণির একক প্রাধান্য সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পরার কথা। একে তারা বলছে ‘পুঁজির সার্বজনীনতা (Universalism)। কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের উত্তর-উপনিবেশিক (উপনিবেশ থেকে মুক্ত স্বাধীন) দেশগুলিতে তা ঘটেনি—অর্থাৎ আমাদের মত এসব দেশে পুঁজিবাদ সার্বজনীন হয়নি। পাশ্চাত্য বা ইউরোপীয় পুঁজিবাদ থেকে উপনিবেশিক পুঁজিবাদ পুরোপুরি ভিন্ন যা সম্পূর্ণ আলাদা সমাজ ও সংস্কৃতি গড়ে তুলেছে এবং পুঁজিবাদের সার্বজনীন হবার প্রবণতাকে আটকে দিয়েছে। দীপেশ চক্রবর্তী, রণজিৎ গুহদের সাবঅলটার্ন স্ট্যাডি (যা আসলে পোস্ট-কলোনিয়াল তত্ত্বেরই একটি রূপ) এ ধরনের ব্যাখ্যা উপস্থাপন করে। ফলে এসব দেশে শ্রেণি ও শ্রেণি সংগ্রাম ইউরোপের মত বিকশিত নয়। তাই মার্কসবাদ নিয়ে তৃতীয় বিশ্বের পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। স্থানীয় ক্যাটাগরি বা ভিন্ন তত্ত্ব দরকার।
আসলে পোস্ট-কলোনিয়াল তত্ত্বকাররা মার্কসের পুঁজির যুক্তিকে (Logic of Capital) বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন। কারণ পুঁজির সার্বজনীনতার (Universality of Capital) অর্থ এই নয় যে সর্বত্র তা একই রকম হবে—যেমনটি তাদের প্রত্যাশা। বরং পুঁজিবাদ নিজেই বহুরূপীতা ও ভিন্নতার জন্ম দেয়। তাই দক্ষিণের দেশগুলিতে পুঁজিবাদ অসম, অ-সরলরৈখিক ও জটিল ভাবে বিকশিত হলেও এর উদ্ভবের ইতিহাস ইউরোপীয় পুঁজিবাদের উদ্ভবের ইতিহাসের সঙ্গে সংযুক্ত। তবে এক্ষেত্রে পাশ্চাত্যের আদর্শ ও ভাবধারা গ্রহণের চাইতে দক্ষিণের দেশগুলির বুর্জোয়া শ্রেণি জনগণের কাছ থেকে উদ্বৃত্ত মূল্য আত্মসাতের পশ্চিমী বিশেষজ্ঞতা আত্মস্থকরণে আগ্রহী হয়েছে। ইউরোপের বাইরে পুঁজিবাদের এই অসম বিকাশের সমস্যা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ-তত্ত্বায়নে এবং উপনিবেশ বিরোধী সংগ্রামে বিংশ শতাব্দীর মার্কসবাদ প্রবলভাবে সক্রিয় ছিল। কাউটস্কির কৃষি সংক্রান্ত কাজ, লেনিনের সাম্রাজ্যবাদ সম্পর্কিত সূত্রায়ণ, ট্রটস্কির সংযুক্ত ও অসম বিকাশের তত্ত্ব, মাও সেতুঙের নয়া গণতন্ত্রের রূপরেখা প্রদান, গ্রামসী কর্তৃক রাষ্ট্র গঠনের ক্ষেত্রে পূর্ব ও পশ্চিম ইউরোপের পার্থক্য তুলে ধরা, ৬০-এর দশকের মার্কসবাদীদের নির্ভরশীলতার তত্ত্ব, সামীর আমিনের অনুন্নয়ন ও ইউরোসেন্ট্রিসিজম বিষয়ক তত্ত্ব, ইমানুয়েল ওয়ালারস্টাইনের কেন্দ্র-পরিধির বিশ্ব ব্যবস্থা তত্ত্ব—এগুলি ওই প্রচেষ্টার কতিপয় দৃষ্টান্ত। ‘পুঁজি’ গ্রন্থে মার্কস পুঁজিবাদের যে পথরেখা তুলে ধরেছিলেন, হুবহু সেভাবে কেন অ-ইউরোপীয় দেশগুলিতে পুঁজিবাদ বিস্তৃত হয়নি—তার ব্যাখ্যা ও করণীয় এখানে পাওয়া যায়।
আমাদের এই উপমহাদেশসহ উপনিবেশবাদের অধীনস্থ দেশগুলিতে পুঁজিবাদ সার্বজনীনতা লাভ করেনি—এই দাবির সপক্ষে পোস্ট-কলোনিয়ালিজমের প্রবক্তারা কতগুলি যুক্তি তুলেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল—প্রথমত, ভারতের বুর্জোয়া শ্রেণি সামন্তবাদের বিরুদ্ধে ও গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেনি এবং এক্ষেত্রে তারা সকল সামাজিক শক্তিকে তাদের পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ করেনি, তাই তারা সমাজের উপর তাদের আধিপত্য (Hegemony) প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি। দ্বিতীয়ত, জাতির সামনে বুর্জোয়া শ্রেণির ‘বীর নায়ক’ হবার ব্যর্থতা পুঁজির অগ্রযাত্রাকে সীমিত করেছে। পুঁজিবাদের ঢেউ উপনিবেশিক দেশগুলিতে স্পর্শ করার পর তা তৎক্ষণাৎ থমকে গেছে।
কিন্তু পোস্ট-কলোনিয়াল তাত্ত্বিকদের এসব বিভ্রান্তির উৎস হল পশ্চিমী ও উপনিবেশিক পুঁজিবাদের ভ্রান্ত পাঠ। কারণ পাশ্চাত্যে বা ইউরোপে পুঁজিবাদের স্বাভাবিক সহচর হিসেবে উদার গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার আত্মপ্রকাশ ঘটেনি কিংবা এ ধরনের রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় বুর্জোয়া শ্রেণিই ছিল একমাত্র কেন্দ্রীয় চরিত্র নয়। অথবা বুর্জোয়া শ্রেণির দয়ার দান নয় উদার গণতন্ত্র। বরং এসব জনগণের দীর্ঘ লড়াইয়ের অর্জন। দ্বিতীয়ত তারা ‘সার্বজনীন’ (Universal) ও ‘সমসত্ত্ব’ (Homogenous)-এর মধ্যে সমীকরণ ঘটায় এবং এই দু’টি শব্দকে সমার্থক ভাবে। পুঁজিবাদের সার্বজনীন অগ্রযাত্রা সর্বত্র সবসময়ই অনিবার্যভাবে বুর্জোয়া শ্রেণির আধিপত্য ও সম্মতিভিত্তিক গণতান্ত্রিক শাসনের দিকে ধাবিত হয় না। পুঁজির কর্তৃত্বের অধীনে যা সার্বজনীন হয় তা সম্মতিসূচক ও সর্বব্যপ্ত গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক শাসন ব্যবস্থা নয়—সার্বজনীন হয় পণ্য উৎপাদন, শ্রমশক্তির পণ্যে রূপান্তর ও শ্রমের ফসল রূপে উদ্বৃত্ত আত্মসাৎ, শ্রম বিভাগ এবং বাজার ও বাজার নির্ভরতা। আর এসবই পুঁজিবাদের মৌলিক বৈশিষ্ট্য যা ক্রমশ সার্বজনীনতা পায়। ইতিহাস এটাই সাক্ষ্য দেয় যে পাশ্চাত্য ও উপনিবেশে সর্বত্রই পুঁজিবাদ মানুষের জীবনের সকল দিকের সমরূপী পরিবর্তন না এনেও পুঁজিবাদকে সার্বজনীন করেছে। তাই বিভিন্ন দেশে পুঁজিবাদের অ-সমরূপ (Heterogeneous) ও ভিন্নতা তার সীমিত সার্বজনীনতার প্রমাণ নয়। আসলে তা পুঁজিবাদেরই অসম বিকাশের পরিণাম।
পোস্ট-কলোনিয়াল তত্ত্ব মতে পাশ্চাত্যে বা ইউরোপে পুঁজির সার্বজনীন অগ্রযাত্রা সূচিত হয় বুর্জোয়া শ্রেণির নেতৃত্বে। সামন্তবাদকে উচ্ছেদ করে তারা। এই অভিযানে তারা কেবল পুঁজিপতি, বণিক, ব্যবসায়ীদেরই যুক্ত করে না—সেই সঙ্গে কৃষক-শ্রমিকদেরও টেনে আনে। একত্রে জমাট বাধা এই জোট একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলে। এই রাজনৈতিক ব্যবস্থা কেবল পুঁজিপতি শ্রেণির সম্পত্তি অধিকার নিশ্চয়তা দেয় না, পাশাপাশি তা উদার, সম্মতিভিত্তিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তোলে। ফলে পুঁজিপতির স্বার্থ সার্বজনীতা পায়, কারণ পুঁজি সমাজের সবার স্বার্থে কথা বলে। আর এভাবে পুঁজিপতি শ্রেণি একদিকে সমাজের প্রাধান্যশীল (Dominant) শ্রেণি হয়ে উঠে, অন্যদিকে তারা শ্রেণি হিসেবে সম্মতিভিত্তিক একচেটিয়া আধিপত্য (hegemony) বিস্তার করতে সক্ষম হয়। ফলে তাদের ক্ষমতা বজায় রাখার জন্য কোনো বলপ্রয়োগের প্রয়োজন দেখা দেয় না। একেই তারা বলছেন আধিপত্য বিস্তারভিত্তিক প্রাধান্য (Domination with hegemony)। অর্থাৎ পাশ্চাত্যের বুর্জোয়াশ্রেণি প্রাধান্য ও আধিপত্য দুটোই প্রতিষ্ঠা করেছে। উপরন্তু পোস্ট-কলোনিয়াল তত্ত্বকাররা যুক্তি দেখায় যে, পুঁজিবাদ যেখানেই জন্ম নেয় সেখানেই সমাজ-সংস্কৃতিকে তার মত করে বদলে ফেলে। কিন্তু অ-পশ্চিমীদেশে সেভাবে পুঁজিবাদী রাজনীতি সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। কারণ এসব দেশের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি ভিন্ন।
রণজিৎ গুহের মতে শ্রমিক শ্রেণির মন ও মস্তিষ্ক দু’টোই দখল করতে পেরেছে ইউরোপের বুর্জোয়া শ্রেণি। কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের বুর্জোয়া শ্রেণি উপনিবেশবাদের ঔরশে জন্ম নেওয়ায় তারা শাসন চালায় নিপীড়নমূলক কায়দায়। পোস্ট-কলোনিয়াল তত্ত্ব বলে যে—পশ্চিমের মত উত্তর-উপনিবেশিক দেশগুলিতে বা পূর্বে পুঁজির সার্বজনীন অগ্রযাত্রা রুদ্ধ হয়েছে। কারণ এসব দেশের বুর্জোয়া শ্রেণি সামন্তবাদকে উচ্ছেদ না করে সামন্তশ্রেণির সঙ্গে আপোষ করেছে এবং কৃষক-শ্রমিক ও অন্যান্য সামাজিক গোষ্ঠী মিলে একটি ব্যাপক জোট গঠনের মাধ্যমে আধিপত্য স্থাপনকারী শক্তি হয়ে উঠতে ব্যর্থ হয়েছে এসব দেশের বুর্জোয়া শ্রেণি। এক্ষেত্রে তারা বরং কৃষক-শ্রমিকের অংশগ্রহণকে দমন করেছে। তারা সবার প্রতিনিধি হয়ে উঠতে পারেনি। এসব দেশের বুর্জোয়া শ্রেণি সম্মতিমূলক, উদার, গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার বদলে অস্থিতিশীল, নাজুক, স্বৈরতান্ত্রিক, কর্তৃত্বপরায়ন রাজনৈতিক শাসন পদ্ধতি প্রায় জোর করে চাপিয়ে দিয়েছে। ফলে অ-ইউরোপীয় দেশগুলির বুর্জোয়া শ্রেণি প্রাধান্য স্থাপন করেছে কিন্তু আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। একে বলা হচ্ছে—আধিপত্য বিস্তার ছাড়াই প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা (Dominance without hegemony)। পোস্ট-কলোনিয়াল তত্ত্বের সহোদর সার্ব অলটার্ন স্টাডির প্রবক্তা রণজিৎ গুহ (Dominance without hegemony: History and power in colonial India) এবং দীপেশ চক্রবর্তী (Provincialiæing Europe) এসব যুক্তি তুলে ধরে পুঁজিবাদের সার্বজনীন বাস্তবতার বিরোধীতা করেছেন।
পোস্ট-কলোনিয়াল তত্ত্বের এসব যুক্তির বাস্তব গ্রহণযোগ্যতা কতটুকু? আসলে পশ্চিমে বা ইউরোপে কোথাও স্বেচ্ছায় স্বপ্রণোদিত হয়ে উদার, মুক্ত, গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বুর্জোয়া শ্রেণি লড়াই করেনি। তারা কখনও শ্রমজীবী জনগণের সম্মতি অর্জন ও স্বার্থরক্ষায় সচেষ্ট হয়নি, বরং বুর্জোয়া শ্রেণি বিপ্লবের পর শ্রমিক শ্রেণির বিরুদ্ধে সর্বাত্মক লড়াই চালিয়েছে। যে উদার, গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার কথা বলা হচ্ছে তা বুর্জোয়া শ্রেণির বিরুদ্ধে তলা থেকে শ্রমজীবি শ্রেণির লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে অর্জিত হয়েছে। বুর্জোয়া শ্রেণি সর্বত্রই ও সবসময়ই ছিল শ্রমজীবি জনগণের রাজনৈতিক অধিকার প্রসারের বিরোধী।
তাছাড়া এশিয়া, আফ্রিকার উত্তর-উপনিবেশিক দেশগুলিতে গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের রুগ্ন দশা এবং স্বৈরাচারি ও কর্তৃত্ববাদী হবার প্রবণতা বুর্জোয়া শ্রেণির ব্যর্থতা থেকে আসেনি। এর মূল কারণ শ্রমিক-কৃষকের আন্দোলন, তাদের সংগঠন এবং তাদের প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক দলগুলির দুর্বলতা।
অন্যদিকে পোস্ট-কলোনিয়াল তত্ত্বকারদের আরেকটি যুক্তি হল—এশিয়া আফ্রিকা ও প্রাচ্যের দেশগুলির যেহেতু নানা ধরনের সামাজিক-সংস্কৃতিক-রাজনৈতিক রীতিনীতি, আচার, প্রথা বিদ্যমান রয়েছে; যা আদর্শ পুঁজিবাদী সংস্কৃতি ও রাজনীতির মত নয়। তাই এসব দেশে পুঁজিবাদ সার্বজনীন হয়নি। কিন্তু এভাবে এসব দেশের সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক ভিন্নতাকে পুঁজিবাদের সার্বজনীন হয়ে উঠার ব্যর্থতার পক্ষে যুক্ত হিসেবে দাঁড় করানোটা হাস্যকর। পুঁজির সার্বজনীন হবার জন্য দরকার পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিশ্বের সর্বত্র বিস্তৃত হওয়া এবং তার পুনরুৎপাদন ঘটা। এর জন্য একটি দেশের প্রচলিত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে পুঁজিবাদের চেনা পথে রূপান্তরের কোনো প্রয়োজন নেই। বাংলাদেশের শ্রমিক লুঙ্গি পরে কারখানায় যায়, ভারতে ও আফ্রিকার অনেক অঞ্চলে কৃষক চাষাবাদের সময় ঈশ্বরের উদ্দেশ্য প্রার্থনা করে, পাকিস্তানের অনেক মানুষ বিপদে পরলে মাজারে সিরনি দেয়, বাংলাদেশে অনেক পুঁজিবাদী প্রতিষ্ঠান সন্ধ্যে বেলায় আগরবাতি বা ধূপ জ¦ালায় কিংবা বাকী দেয় না, ভারতের পুঁজিপতিরা প্রায় জ্যোতিষীর দ্বারস্থ হন। এসব সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যতা কখনো যুক্তিগ্রাহ্য নয় বরং দেখতে হবে পুঁজিবাদের অর্থনৈতিক সম্পর্কের বিস্তার এখানে ঘটেছে কি না।
এখন পোস্ট-কলোনিয়াল তত্ত্বের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সমালোচনার দিকে দৃষ্টিপাত করা যাক। ওই তত্ত্ব প্রায়শ মার্কস ও মার্কসবাদীদের বিরুদ্ধে ইউরোপকেন্দ্রীকতা ও শ্রেণি-সর্বস্বতার (Class reductionism) অভিযোগ আনে। বিশেষত এই অভিযোগ তখনই আরো জোরে শোরে উঠে যখন পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে জাতি, বর্ণ, ধর্ম, সংস্কৃতি নির্বিশেষে সকল শ্রমজীবী মানুষকে লড়াইয়ের আহ্বান জানায় তারা। আর এই অভিযোগের ভিত্তি হল মার্কসবাদীরা কেবল শ্রমিক শ্রেণির জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংহতির উপর জোর দেয় কিন্তু সাবেক উপনিবেশ কবলিত বা উত্তর উপনিবেশিক দেশগুলির জনগণের অভিজ্ঞতাকে উপেক্ষা করে। তাই এসব দেশের জনগণকে আগে নিজেদের মনকে বি-উপনিবেশিকায়ন বা ডি-কলোনাইজ (Decolonize) করতে হবে, যাতে তারা পাশ্চাত্য (উপনিবেশ) কর্তৃক চাপিয়ে দেওয়া ধ্যান-ধারণা থেকে মুক্ত করে নিজেদের মুক্তির জন্য লড়াইয়ে শামিল হয়।
পোস্ট-কলোনিয়াল অভিযোগের বিপরীতে মার্কসবাদ অবশ্যই পূর্ব ও পশ্চিম, কিংবা উত্তর ও দক্ষিণের ভিন্নতাকে স্বীকৃতি দেয়। কারণ পাশ্চাত্যে ও অ-পাশ্চাত্যে পুঁজিবাদের বিকাশের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভিন্নতা রয়েছে। ফলে অ-পাশ্চাত্য দেশের শাসন পদ্ধতি নিপীড়নমূলক প্রবণতা ধারণা করে। আর নানাবিধ কারণও রয়েছে—যেমন দুর্বল অর্থনীতি, সংসদীয় গণতন্ত্রের ধারাবাহিক উপস্থিতি না থাকা, বিপ্লবের মধ্য দিয়ে নতুন শক্তির রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল। তবে শুধু পূর্বে বা তৃতীয় বিশ্বে নয়, পাশ্চাত্যের দেশগুলিতেও পুঁজিবাদের বিকাশে ভিন্নতা রয়েছে। যেমন: আমেরিকার অর্থনীতির থেকে অস্ট্রেলিয়ার অর্থনীতি ভিন্ন। তাই এটা ভাবা ভুল ভিন্নতার কারণে পাশ্চাত্যের দেশগুলি জনগণের সম্মতি আদায়ের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। বরং ইতিহাস বারবার সাক্ষ্য দেয়—শ্রেণি বিভক্ত সমাজ রূপে পাশ্চাত্যের পুঁজিবাদ তার শ্রেণি শোষণ-শাসন-নিপীড়ন ভিত্তিক ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজনে সহিংস বর্বর হতে বিন্দুমাত্র কসুর করে না।
সমাজ বদলের বিপ্লবী তত্ত্ব রূপে মার্কসবাদ ইউরোপ থেকে উদ্ভূত হলেও তা সমগ্র অ-ইউরোপীয় দেশের বিশেষ অবস্থাকেও ধারণ করে। রুশ বিপ্লব, চীন বিপ্লব, ভিয়েতনাম ও ল্যাটিন আমেরিকার গেরিলা যুদ্ধ, আফ্রিকার উপনিবেশবাদ বিরোধী সংগ্রাম—এসব দেশের পুঁজিবাদের বিশেষ ধরনের উপর ভিত্তি করেই সংঘটিত হয়েছে। আর এসব মার্কসবাদের সেই অ-ইউরোপীয় রূপেরই সাক্ষ্য দেয়।
এই সাংস্কৃতিক ভিন্নতার সূত্রে পোস্ট কলোনিয়ালিজমের প্রবক্তারা মার্কসের শ্রেণি ও শ্রেণিসংগ্রাম তত্ত্বের বিরুদ্ধে আক্রমণ চালায়। তাদের মতে ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশের মত দেশগুলিতে শ্রমজীবী জনগণের সংগ্রাম কেবল শ্রেণির ভিত্তির সংগঠিত হয়নি—এই সংগ্রামে ধর্ম, বর্ণ ও আদিবাসীদের বিষয়ও যুক্ত ছিল। কারণ এখানকার শ্রমিক, কৃষক, দলিত, আদিবাসী—তাদের সংগ্রামের ক্ষেত্রে ধর্মীয় প্রতীক ব্যবহারসহ ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান করে। কিন্তু এতে করে কি শ্রেণি সংগ্রাম খারিজ হয়ে যায়? ওদের সংগ্রাম কি শ্রেণি চরিত্র হারায়? এই উপমহাদেশ সহ বিশ্বের সর্বত্র—এমনকি ইউরোপ কৃষক, শ্রমিক অধিবাসীসহ নিপীড়িত মানুষের শ্রেণি সংগ্রামে আমরা নানা লোকাচার, ধর্মীয় প্রতীক ও আচার-অনুষ্ঠানের উপস্থিতি দেখতে পাই। অনেক সময় ব্রিটিশ ভারতেও নানা সময়ে ধর্মীয় মোড়কে শ্রেণি সংগ্রামের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে।
এটা ঠিক যে পুঁজিবাদের আত্মপ্রকাশ প্রথম ঘটেছে ইউরোপে এবং মার্কস একজন ইউরোপীয় রূপে এই পুঁজিবাদের উপর ভিত্তি করে তার রাজনৈতিক তত্ত্ব গড়ে তুলেছে। কেন পুঁজিবাদ ইউরোপে উদ্ভূত হল সে ব্যাখ্যাও তিনি দিয়েছেন। তারপর পুঁজিবাদ ইউরোপ ছাড়িয়ে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। পুঁজিপতি শ্রেণি এখন নানা জাতি, বর্ণ, দেশের অংশীদারিত্বে গঠিত। বিশ্বের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রমজীবী শ্রেণি বর্তমানে ইউরোপের বাইরে বাস করে। এটা এখন ঐতিহাসিক সত্য এবং বিদ্যমান বাস্তবতা। তাহলে এর স্বীকৃতি দিলে তা কেন ইউরোপকেন্দ্রীক বলে অভিযুক্ত হতে হবে।
এমন কি পোস্ট-কলোনিয়াল তত্ত্ব ভারতের প্রসঙ্গ টেনে উপনিবেশিকতা সমর্থন করার অপবাদে মার্কসকে অভিযুক্ত করে বলে—মার্কসও একজন শ্বেতাঙ্গ উপনিবেশবাদী, তিনি পুঁজিবাদকে প্রগতিশীল সামাজিক ব্যবস্থা মনে করেন। কিন্তু এই মিথ্যা অভিযোগ মার্কসকে খণ্ডিত, যান্ত্রিক ও স্থূলভাবে জানার ভ্রান্তি। মার্কস দাস ব্যবস্থাসহ উপনিবেশবাদের তীব্র সমালোচক ছিলেন। তিনি উপনিবেশবাদ এবং তার অধীনস্থ দেশের জনগণের উপর এর প্রভাব নিয়ে প্রচুর কাজ করেছেন। বিশেষ করে ভারত ও আয়ারল্যান্ডে ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসন নিয়ে মার্কস-এঙ্গেলসের প্রচুর লেখাপত্র রয়েছে। কীভাবে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী ব্যক্তিগত সাম্রাজ্যবাদ রূপে ভারতবর্ষে অনুপ্রবেশ করলো, কীভাবে সমৃদ্ধ স্থানীয় বস্ত্রশিল্পের ধ্বংস সাধন করা হলো বৃটেনের শিল্প পুঁজিবাদ বিকাশের স্বার্থে, অগ্নিসংযোগ ও তরবারি দিয়ে কীভাবে ব্রিটিশ উপনিবেশ শোষণ-শাসন অব্যাহত রেখেছিল, ফলে কীভাবে এখানে বারংবার দুর্ভিক্ষ বৃটিশের কারণে ঘটেছিল—এসব বিবরণ আমরা মার্কসের লেখা থেকেই পাই।
এখানে মূল অভিযোগ হল—মার্কস রাজনৈতিক মুক্তির ক্ষেত্রে ইউরোপকেন্দ্রীক (Eurocentric) মডেলেরই সমর্থক ছিলেন, যা অ-পাশ্চাত্যে সমাজের উপনিবেশভূক্ত মানুষের অভিজ্ঞতাকে ও তাদের অধিকারহীনতাকে অবজ্ঞা করে। ফলে তিনি ভারত ও আফ্রিকার উপর গবেষণা চালিয়ে সাম্রাজ্যবাদের একটি সামগ্রিক বিশ্লেষণ তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়েছেন। এমনকি মার্কস নাকি আধুনিকতার জন্য প্রয়োজনীয় বিধায় উপনিবেশিকতাকে ন্যায্যতা প্রদান করেছেন। ঐতিহাসিক বিকাশের ইউরোপীয় মডেল বিশ্বের বাদবাকি অংশের উপর চাপিয়ে দিয়েছেন।
আরো অগ্রসর হয়ে এডওয়ার্ড সাঈদ অ-পাশ্চাত্য বিশ্বকে ‘বর্ণবাদী কায়দায় প্রাচ্যকরণের’ (racist orientalisation of the non-western world) জন্য দায়ী করেছেন মার্কসকে। তাঁর অভিযোগ আধুনিক বিশ্বের ইতিহাস ব্যাখ্যায় উপনিবেশবাদ, বর্ণ-গোত্র, পরিচয়, জাত-পাত—এ সব বিষয় মার্কসের কাছে উপেক্ষিত ছিল। ১৮৫৩ সালে নিউইয়র্ক টাইম পত্রিকায় প্রকাশিত ভারত সম্পর্কে মার্কসের লেখাপত্রে নাকি ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের প্রতি বিস্ময়করভাবে সমর্থন প্রদর্শন করেছেন তিনি। মার্কসের বিরুদ্ধে পোস্ট-কলোনিয়াল তত্ত্বের এ সব অভিযোগের ভিত্তি হল—১৮৪৮ সালের কমিউনিস্ট ইশতেহার সহ চীন ও ভারত প্রসঙ্গে মার্কসের দু’একটি লেখা—প্রথম দিকের লেখালেখি।
কিন্তু আমরা যদি ১৮৪১ থেকে মার্কসের জীবিতকাল ১৮৮৩ পর্যন্ত তাঁর সব রচনাগুলি বিচার করি তাহলে এসব অভিযোগের কোনো ভিত্তি থাকে না। তাছাড়া ভারত সম্বন্ধে জানার মার্কসের তথ্যের উৎস ছিল তৎকালীন বৃটেনের প্রাপ্ত তথ্য। এমনকি বিরোধিতা করতে গিয়ে তারা মার্কসের ১৮৪৮ সালে লিখিত কমিউনিস্ট ইশতেহারের বক্তব্যকে ১৮৫৩ সালের বক্তব্য বলে চালিয়েছে। এখানে বলা হয়েছে: ‘সকল উৎপাদন যন্ত্রের দ্রুত উন্নতি ঘটিয়ে যোগাযোগের অতি সুবিধাজনক উপায় মারফৎ বুর্জোয়ারা সভ্যতায় টেনে আনছে সমস্ত, এমনকি অসভ্যতম জাতিকেও। যে জগদ্দল কামান দেগে সে সমস্ত চীনা প্রাচীর চূর্ণ করে, অসভ্য জাতিদের একরোখা বিজাতি-বিদ্বেষকে বাধ্য করে আত্মসমর্পনে—তা হল তার পণ্যের সস্তা দর। সে সকল জাতিকে বাধ্য করে বুর্জোয়া উৎপাদন পদ্ধতি গ্রহণে। অন্যথায় বিলুপ্ত হয়ে যাবার ভয় থাকে; বাধ্য করে সেই বস্তু গ্রহণে যাকে বলে সে সভ্যতা—অর্থাৎ বাধ্য করতো তাদের বুর্জোয়া বনতে। এক কথায়, বুর্জোয়া শ্রেণি নিজের ছাঁচে জগৎ গড়ে তোলে।’ উপরোক্ত উদ্ধৃতিতে কোথাও কি উপনিবেশবাদকে সমর্থন বা প্রশংসা করার কিংবা অ-ইউরোপীয় বিশ্বকে খাটো করার কোনো সত্যতা মিলছে! আসলে মার্কস এখানে পুঁজিবাদের যাত্রাপথে বুর্জোয়া শ্রেণির ভূমিকা তুলে ধরেছেন মাত্র। এমনকি মার্কসের ১৮৫৩ সালের ঐসব লেখাপত্র যত্ন করে পড়লে দেখা যায় তিনি শুধু ভারতীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রশংসাই করছেন না, সেই সঙ্গেই একজন বিরল ইউরোপীয়ান হিসেবে ভারতের স্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। এমনকি বহুল সমালোচিত মার্কসের এসব লেখায় তিনি যে, ব্রিটিশদের ‘বর্বর’ এবং ‘কুকুর’ বলে গাল দিয়েছেন—সেটাও নিন্দুকেরা খেয়াল করে না।
তবে ১৮৫৬-৫৮ এই সময়কালে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে জনগণের ব্যাপক গণপ্রতিরোধের প্রেক্ষাপটে ভারত ও চীন সম্পর্কে মার্কসের ভাবনায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসে। কিন্তু মার্কসের এসব পরিবর্তিত চিন্তা-ভাবনা সমৃদ্ধ লেখাপত্র পোস্ট-কলোনিয়াল তত্ত্বকাররা উদ্ধৃত করেন না। যেমন: ১৮৫৬ সালে প্রকাশিত ট্রিবিয়নর একটি লেখায় মার্কস শুধু এশিয়ার পশ্চাদপদতাকে উল্লেখ করেননি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে চীনের বিরুদ্ধে বৃটেনের উপনিবেশিক বর্বরতাকে তুলে ধরেছেন। চীন সম্বন্ধে মার্কস এখানে বলছেন: ‘ক্যান্টনের নিরীহ নাগরিক ও নির্বিরোধী ব্যবসায়ীদের হত্যা করা হয়েছে, তাদের ঘরবাড়ি ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে, মানবতার দাবি লংঘিত...ইংরেজদের একটি অভিযোগের বিপরীতে চীনদের ৯৯টি সহিংসতার প্রমাণ রয়েছে।’ ১৮৫৭ সালে সংঘটিত ঐতিহাসিক সিপাহী বিদ্রোহকে মার্কস ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম রূপে অভিহিত করে ট্রিবিউনে লিখেছেন। ১৮৫৮ সালে যখন ইউরোপের শ্রমিক শ্রেণির আন্দোলনের সাময়িক ভাটা পরে তখন এঙ্গেলসকে লেখা চিঠিতে তিনি ওই বিদ্রোহীদের ‘আমাদের শ্রেষ্ঠ মিত্র’ রূপে চিহ্নিত করেছেন। কারণ ব্রিটিশ শ্রমিক শ্রেণির শত্রুও ওই একই ব্রিটিশ শাসক শ্রেণি।
উল্লেখ্য, প্রথমদিকে যে মার্কস ভারতকে ইতিহাসহীন দেশ মনে করেছিলেন, পরে তিনি আবার ভারতে উপনিবেশিকবাদ বিরোধী বিদ্রোহের স্বপ্ন দেখেছেন। আসলে উপনিবেশবাদ নিয়ে মার্কসের চিন্তা-ভাবনা-কাজ-কর্মের ক্রমবিকাশ অনেকে এখনো উপলব্ধি করতে ব্যর্থ।
এটাও মার্কসের বিরুদ্ধে পোস্ট-কলোনিয়াল তত্ত্বকারদের ভুল অভিযোগ যে, তিনি আদিম সাম্যবাদ-সামন্তবাদ-পুঁজিবাদ-সমাজতন্ত্র সাম্যবাদ—এভাবে সমাজের সরল একরৈখিক বিকাশকে তুলে ধরেছেন, যা অ-ইউরোপীয় সমাজ বিকাশের বিশেষতাকে ধারণ করে না। এটা ঠিক যে, ‘জার্মান ভাবাদর্শ’ (১৮৪৬) গ্রন্থে মার্কস-এঙ্গেলস আর্থ-সামাজিক বিকাশের এই পথরেখার কথা বলেছেন। কিন্তু পরবর্তীকালে ১৮৫০ সালের পর থেকে মার্কস এই অবস্থানের কিছুটা পরিবর্তন ঘটিয়েছেন। ১৮৫৭-৫৮ সালে ‘গ্রুনডিসে’ রচনায় তিনি সমাজ কাঠামোকে সম্প্রসারিত করে ইউরোপের গ্রীক, রোমান ও সামন্ত ব্যবস্থাকে ‘এশীয় উৎপাদন পদ্ধতি’ রূপে বর্ণনা করছেন, যা ভারত, চীন ও মধ্যপ্রাচ্যের প্রাক-উপনিবেশিক কৃষি সাম্রাজ্যের সঙ্গে যুক্ত। পরে তিনি ‘ক্যাপিটাল’ গ্রন্থে সমাজের বিকাশের স্তরকে ‘এশিয়াটিক, প্রাচীন, সামন্ত এবং আধুনিক বুর্জোয়া উৎপাদন পদ্ধতি’ রূপে দেখিয়েছেন। যদিও তিনি এই ভারতসহ অন্যান্য দেশের বিশেষ স্তর ‘এশিয়াটিক উৎপাদন পদ্ধতি’ নিয়ে আরো গবেষণা করার সুযোগ পাননি। তাই এটা প্রমাণিত যে ইউরোপীয় সমাজ বিকাশের সরল এক রৈখিক ছককে বাদ-বাকী বিশ্বের উপর মার্কস কখনো চাপিয়ে দেননি।
শুধু তাই নয়, সেই সময়কার রাশিয়া সমাজ ব্যবস্থার বিশেষ রূপ ‘মির’ বা গ্রামীণ কমিউন ব্যবস্থার বদৌলতে এই দেশ ইউরোপের বিকল্প পথে সাম্যবাদের দিকে এগুতে পারে—সে সম্ভাবনাও তিনি দেখেছেন। ১৮৮১ সালে রাশিয়ার বিপ্লবী বুদ্ধিজীবি ভেরা জাসুলিচ সহ নানা জনকে লেখা চিঠিতে এর উল্লেখ পাওয়া যায়, যা মার্কসের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগকে সহজেই খারিজ করে।
এখানে আরো একটি বিষয় লক্ষ্যণীয় যে, ১৮৮২ সালে কমিউনিস্ট ইসতেহারের রুশ সংস্করণে ইউরোপ—বিশেষ করে ইংল্যাণ্ডে নয়, বরং রাশিয়ায় বিপ্লবের সম্ভব্যতা দেখে এঙ্গেলস বলছেন: ‘যদি রাশিয়ার বিপ্লব পাশ্চাত্যে সর্বহারার বিপ্লবের সংকেত হয়, তাহলে তারা পরস্পরের সম্পূরক, আর সেক্ষেত্রে রাশিয়ার বর্তমান জমির সামাজিক মালিকানা সাম্যবাদী বিকাশের যাত্রাবিন্দু রূপে ভূমিকা রাখবে।’ এখন তাহলে প্রশ্ন—মার্কস কিভাবে ইউরোপকেন্দ্রীক বা ইউরোসেন্ট্রিক। বরং উল্টোটাই সত্যি যে, মার্কস সমাজের বিকাশ ও বিপ্লবের বহুমুখী এবং বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটকেই তুলে ধরেছেন।
মার্কস দেখিয়েছেন বিশ্ব বাণিজ্য, উপনিবেশ ও পুঁজিবাদ এবং পরবর্তীতে সাম্রাজ্যবাদ কীভাবে পরস্পর সম্পর্কিত। পুঁজির আড়ালে আছে উপনিবেশ। তেমনি তাঁর শিক্ষা হল—উপনিবেশবাদ বিরোধী সংগ্রাম হল পুঁজিবাদ বিরোধী সংগ্রামের পূর্বশর্ত এবং তাই উপনিবেশবাদ বিরোধী সংগ্রামের তাৎপর্য উপলব্ধি করা গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ পুঁজিবাদ বিরোধী বিপ্লব করতে হলে আগে উপনিবেশবাদ বিরোধী বিপ্লব সম্পন্ন করতে হবে। মার্কসের উপনিবেশবাদ সংক্রান্ত চিন্তার গতিমুখ ছিল উপনিবেশ অবসানমুখী। ভারতে ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসনের ধ্বংসাত্মক এবং ইতিবাচক ও সম্ভবনাময়—এই দুই দ্বান্দ্বিকতা মার্কস দেখিয়েছেন। একদিকে তা দেশীয় শিল্পের ও গ্রাম সমাজের ধ্বংস সাধন করেছে। অন্যদিকে মার্কস বলছেন: ‘‘ব্রিটিশ তরবারী, বৈদ্যুতিক টেলিগ্রাফ, রেলপথ এবং ব্রিটিশ ‘ড্রিল সার্জেন্ট’ দ্বারা শিক্ষিত সেনাবাহিনী উপনিবেশের মুক্তির আবশ্যিক শর্ত হয়ে দাঁড়াবে। উপরোক্ত যন্ত্র, প্রযুক্তি এবং এক নব্য শিক্ষিত সামাজিক স্তর—এই তিন উপাদানের সমন্বয়ে ব্রিটিশ শাসনের অধীনেই এক আধুনিক শ্রেণি গড়ে উঠছে। যারা নিজেরা দেশের ভাগ্য নির্ধারণ করবে।’’
প্রথম আন্তর্জাতিক সম্মেলনে (১৮৬০) মার্কস তাঁর এই উপনিবেশিকবাদ বিরোধী আন্তর্জাতিকতাবাদী যে অবস্থান ব্যক্ত করেন তা হল—সব উপনিবেশবাদ বিরোধী জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের সঙ্গে ইউরোপের শ্রমিক শ্রেণিকে মিত্রতা ও সংহতি গড়ে তুলতে হবে। পরবর্তীকালে তাই আমরা দেখতে পাই—আমেরিকার দাস প্রথা বিরোধী সংগ্রাম, পোল্যান্ড ও আয়ারল্যান্ডের জাতীয় স্বাধীনতার লড়াইয়ের পক্ষে প্রথম আন্তর্জাতিক ব্যাপক সংহতি প্রচারণা চালায়। এক্ষেত্রে মার্কস যুক্তি দেন যে, ইউরোপীয় শ্রমিক শ্রেণিকে ইউরোপকেন্দ্রীক (Eurocentric) হলে চলবে না। বরং তাদের নিজস্ব ‘বৈদেশিক নীতি’ প্রণয়ন করতে হবে, যাতে করে তারা সারা বিশ্বের শ্রমিক শ্রেণির মুক্তি সংগ্রামের অংশীদার হয়ে ওঠে।
উপরন্তু মার্কস তাঁর জীবনের একেবারে শেষ দিকে আলজেরিয়ায় অবস্থান কালে অ-ইউরোপীয় দেশের কৃষক ও গ্রামীণ সমাজের নিয়ে গভীর সমীক্ষায় উদ্যোগী হয়েছিলেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল—এ অঞ্চলের কৌম্য সমাজ কাঠামোকে আবিষ্কার করা, যা সমাজতান্ত্রিক রূপান্তরের সহায়ক। তাই আমরা দেখি—ভারত, ইন্দোনেশিয়া, মরক্কো, মেক্সিকো, পেরু নিয়ে মার্কস তাঁর নোট-খাতার হাজার হাজার পাতা ভরিয়ে ফেলেছেন। এ সময় তিনি আলজেরিয়ায় ফ্রান্সের উপনিবেশিক শোষণ-শাসনের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা মুখর হন। এখান থেকেই তিনি আরব ও মুসলিম সমাজের গঠন নিয়ে অনুসন্ধান চালান এবং তাদের সামাজিক মালিকানার ধরন নিয়ে আরো জানার জন্য আগ্রহী হয়ে ওঠেন। সেই সঙ্গে আরব বিশ্বে ফ্রান্সের উপনিবেশিক লুণ্ঠন ও দখলদারিত্ব এবং মিশরে ব্রিটিশ উপনিবেশিক হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে দাঁড়ান। পুঁজিবাদ, উপনিবেশবাদ, সাম্রাজ্যবাদ যে প্রেক্ষাপটে বিচার করি না কেন—মার্কসের অবস্থান সবসময়-সর্বত্রই ছিল নিপীড়কের বিরুদ্ধে, নিপীড়িতের পক্ষে।
আমরা কি তাই প্রশ্ন করতে পারি না যে, কোনটা আসলে প্রকৃত মার্কস? মার্কসের খণ্ডিত ও বিক্ষিপ্ত ক্ষুদ্র নমুনা, যেখানে তাঁকে ইউরোপকেন্দ্রীক রূপে অভিযুক্ত করার সুযোগ রয়েছে—না কি মার্কসের সামগ্রিক চিত্রায়ন, যেখানে তিনি ইউরোপ কেন্দ্রীকতার গন্ডীকে অতিক্রম করছেন!
অনেক সময় পোস্ট-কলোনিয়াল তত্ত্বের প্রবক্তারা মার্কস-এঙ্গেলসের পত্রালাপের কিছু লাইন বা শব্দ উদ্ধৃত করে তা আধুনিক বর্ণবাদ বিরোধী মানদণ্ডের উপযুক্ত নয় বলে তাদের অভিযুক্ত করেন। কিন্তু তারা ভুলে যান যে প্রায় ১৫০ বছরেরও আগে মার্কস-এঙ্গেলসের যুগে আজকের মানদণ্ড প্রয়োগ কতটা যৌক্তিক!
এখন পোস্ট-কলোনিয়ান তত্ত্বকারদের বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযোগ উত্থাপিত করা যায় যে, কেন উপনিবেশবাদের উদ্ভব ঘটলো এবং আজকের সাম্রাজ্যবাদের উৎপত্তি কিভাবে হলো—তা তারা ব্যাখ্যা করতে ব্যর্থ। বৈশ্বিক পুঁজিবাদের মূল বিরোধটা ধারণ করতেও তারা অপারগ—যে বিরোধ শ্রেণি দ্বন্দ্বকেই তুলে ধরে। কারণ কী পশ্চিম বা পূর্ব, কি উত্তর বা দক্ষিণ সর্বত্র প্রতিটি দেশে শ্রেণি এবং শ্রেণি সংগ্রাম বিদ্যমান। কিন্তু আমরা যারা এই বিশ্ব বদলাতে চাই তাদের জন্য, পোস্ট-কলোনিয়াল তত্ত্ব কোনো লড়াইয়ের কিংবা কোন সংহতির পথ দেখায় না।
তাছাড়া এই তত্ত্ব ইউরোপ বা পশ্চিমকে একটি অভিন্ন সামগ্রিকতা রূপে বিবেচনা করার ভ্রান্তিতে ভোগে। ইউরোপ/পশ্চিম আদৌ পার্থক্যহীন বা একই রকম ব্লক নয়। ইউরোপের প্রতিটি পুঁজিবাদী-উপনিবেশবাদী-সাম্রাজ্যবাদী দেশ হল শ্রেণি বিভক্ত। যেখানে মুষ্টিমেয় অস্তিত্বশীল পুঁজিপতি শ্রেণি সম্পদ ও উৎপাদনের মালিক এবং বিপুল সংখ্যাধিক্য শ্রমজীবি। তাদের দ্বারা শুধু শোষিত-শাসিত-নিপীড়িত হয় না, শ্রমজীবিদের নীতি-নির্ধারণী ক্ষমতাও থাকে না। তাই উপনিবেশবাদের মূলহোতা সাধারণভাবে ইউরোপীয়ানরা নয় বরং অপরাধী হচ্ছে ইউরোপের বণিক, ব্যবসায়ী, অভিজাত শ্রেণি ও রাজনীতিবিদরা যারা উপনিবেশিক আগ্রাসনের ন্যায্যতা দিয়েছে। কারণ আমরা দেখি কী বৃটেনে বা ইউরোপে বা ফ্রান্সে—কোথাও উপনিবেশিক স্থাপনের প্রশ্নে ভোট নেওয়া হয়নি। এমনকি উপনিবেশিক দখলদারিত্বের সময় ইউরোপের কৃষকরাও এ ব্যাপারে প্রায় পুরোপুরি অজ্ঞাত ছিল।
ঠিক তেমনি অ-পাশ্চাত্য বা পূর্বকে অভিন্ন বা একই রকম ভাবা ভুল। সেই সঙ্গেই উত্তর-উপনিবেশিক দেশের বুর্জোয়ারা ইউরোপের বর্ণবাদের শিকার—এ ভাবে বিচার করাটাও ঠিক নয়। আবার আজকের সাম্রাজ্যবাদ শ্বেতাঙ্গবাদ (Whiteness) দ্বারা চালিত হচ্ছে—এটাও ভ্রান্ত ধারণা। অনুরূপভাবে উপনিবেশবাদ-সাম্রাজ্যবাদকে পূর্ব ও পশ্চিম কিংবা শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গ মধ্যকার লড়াই রূপে চিত্রিত করে বর্তমান বিশ্ব ক্ষমতা সম্পর্ককে শ্বেতাঙ্গ রাষ্ট্রগুলির দ্বারা নিপীড়িত অ-শ্বেতাঙ্গ রাষ্ট্রগুলি ঘেরাও হয়ে আছে—এভাবে দেখাটাও অযৌক্তিক। কারণ এভাবে ইউরোপ বিরোধীভাবে বিচার করা আজ আদৌ কোনো বিপ্লবী অবস্থান নয়। অনেক ক্ষেত্রে প্রতিক্রিয়াশীলতাও বটে। কারণ উপনিবেশ কালে নিপীড়িত জাতি ও দক্ষিণের দেশগুলিতে শ্রেণিবিভক্তি নতুন নয়, আগে থেকেই বিদ্যমান ছিল। তবে উপনিবেশ স্থাপনকারীরা দেশগুলি যখন অস্ট্রেলিয়া ও উত্তর আমেরিকার মত দেশগুলির শ্রেণিহীন সমাজের মুখোমুখি তখন তারা ব্যাপক গণহত্যা চালিয়ে সামাজিক-সমবায় মালিকানা ভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থাকে ধ্বংস করেছিল। কিন্তু দক্ষিণের শ্রেণিবিভক্ত দেশগুলিকে পদানত করতে উপনিবেশবাদী দেশগুলি ভিন্নভাবে অগ্রসর হয়েছিল। তারা প্রথমে স্থানীয় শাসক ও মালিক শ্রেণির সঙ্গে আপোষ ও সমঝোতা স্থাপন করেছিল। মোগল শাসক যদি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীকে বাণিজ্য করার অনুমতি না দিত, তাহলে ব্রিটিশ উপনিবেশ কীভাবে ভারতে প্রতিষ্ঠিত হতে পারতো। আসলে ব্রিটিশ ও মোগলদের এই অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক সমঝোতা উভয়ের শ্রেণিগত স্বার্থেই ঘটেছে—যা দু’পক্ষের জন্যই সুবিধাজনক ছিল। পরবর্তীকালে ভারতসহ অন্যান্য দেশের উপনিবেশবাদ বিরোধী জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম—তা যতটা বিপ্লবী হোক—এই শ্রেণি বিভাজনকে নির্মূল করেনি। সে জন্যই যেভাবে উপনিবেশবাদ, পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে পাশ্চাত্য এবং অ-পাশ্চাত্য দেশের শ্রমজীবিরা লড়াই চালায়; ঠিক সেভাবেই ইউরোপের লেনিন এবং অ-পাশ্চাত্য ভারতের এম এন রায়—উভয়েই মনে করেছেন—উপনিবেশিক দেশের নিপীড়িত শ্রেণি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা অক্ষুণ্ন রেখে তাদের মুক্তি ঘটাতে পারবে না।
পোস্ট-কলোনিয়াল তত্ত্ব তাদের কথিত গ্লোবাল সাউথ (Global South) বা অনুন্নত/উন্নয়নশীল দেশগুলির শ্রেণি ভিন্নতার বাস্তবতা তুলে ধরে। কিন্তু সে ক্ষেত্রে তারা বর্তমান সাম্রাজ্যবাদকে ব্যাখ্যা করতে ব্যর্থতার পরিচয় দেয় এবং বৈশ্বিক শাসক শ্রেণির দাবনীয় উপস্থিতি সম্পর্কে কোনো কথা বলে না।
আশ্চর্যজনক হল—পোস্ট-কলোনিয়াল তত্ত্বের প্রবক্তরা তাদের রাজনীতি কেন্দ্রীভূত করতে বলে ব্যক্তিকে ঘিরে। ফলে ব্যক্তির পক্ষে তাদের পোশাক, ভাষা বা ভোগের পছন্দ-অপছন্দ, সম্পর্ক—এসব পরিবর্তন করা সহজ হয়। এই ব্যক্তিকেন্দ্রীকতার জন্য পাশ্চাত্যে সামগ্রিক কোনো সংগ্রাম গড়ে ওঠে না পুঁজিবাদী শাসন ব্যবস্থা বদলের লক্ষ্যে।
পোস্ট-কলোনিয়াল তত্ত্ব শ্রেণি ও শ্রেণি সংগ্রামকে উপেক্ষা করলেও তৃতীয় উত্তর-উপনিবেশিক দেশগুলির শ্রেণি সংগ্রাম প্রবলভাবে দৃশ্যমান। তাই তারা যখন শ্রেণি সংগ্রাম ভিত্তিক মার্কসবাদ এখন অপ্রাসঙ্গিক বিধায় তা খারিজ করে দেয়, তখন তাদের এটা প্রমাণ করতে হবে যে—এসব দেশে শ্রমজীবিরা শোষিত হয় না, তারা এর বিরুদ্ধে লড়াই করে না বা করতে পারে না।
পোস্ট-কলোনিয়ান তত্ত্ব এখন তাদের নিজেদের ভেতর থেকে সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছে। এই তত্ত্বের অনেক প্রবক্তরা এখন এর দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতা তুলে ধরছে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন জে কে ওয়াটসন, গ্যারি ওয়াইল্ডার, নেইল ল্যাজারাস, এনিয়া লুম্ভা, এন্টোইনেটি বারইন, টিমোথি ব্রেননান, সুভির কাউল, জেড এসটি, মাট্টি চানজি প্রমুখ। এক্ষেত্রে তাদের সমালোচনার মূল দিকগুলি হলো এই তত্ত্বের উপনিবেশকাল ও এর ভুগোল সংক্রান্ত ভ্রান্তি। কারণ উপনিবেশবাদের অবসান ঘটেছে এবং এখন হলো উত্তর উপনিবেশিক বিশ্ব—এটি ভ্রান্ত ধারণা। আসলে নয়া উপনিবেশবাদ, নয়া সাম্রাজ্যবাদ ইত্যাদি নানা রূপেই উপনিবেশবাদ এখনো বহাল রয়েছে। অথচ এই তত্ত্ব এই বাস্তবতাকে বিকৃত ও আড়াল করে। পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী-মুক্তবাজারমুখী বিশ্বায়নের মূল এজেন্ট বিশ্বব্যাংক আইএমএফ বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার কর্মকাণ্ড সম্পর্কে নিশ্চুপ থাকে। তাছাড়া বিশ্বের উদ্ভূত সমস্যাগুলি মোকাবিলা করতে পোস্ট-কলোনিয়ান তত্ত্বের পদ্ধতিগত হাল-হাতিয়ারগুলি একেবারেই অকেজো। বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিপর্যয় পরবর্তী তথ্য প্রযুক্তিগত যুগ, বিশ্বে অর্থনৈতিক মন্দা, ইউরোপে অর্থনৈতিক কৃচ্ছতা ও বর্তমান পুঁজিবাদী, সাম্রাজ্যবাদী বিশ্ব ব্যবস্থাকে তা ব্যাখ্যা করতে অপারগ। ল্যাজারাস তার দ্য পলিটিকাল আনকনশাস গ্রন্থে তুলে ধরেছেন যে, কীভাবে পোস্ট-কলোনিয়ান তত্ত্বকাররা তাদের গুরু ফ্রান্জ ফ্যানন, এডওয়ার্ড সাইদ এবং ফ্রেডরিখ জেনসনকে ভুলভাবে পাঠ করেছেন। এখানে তিনি পোস্ট-কলোনিয়ান তত্ত্বের অন্যতম প্রবক্তা হোমি ভাভাকে তিরস্কার করেছেন ফ্রান্জ ফ্যাননকে হালকাভাবে উপস্থাপনের জন্য—যা ফ্যাননের উপনিবেশবাদবিরোধী ভূমিকাকে খাটো করে। কারণ ফ্যানন যে উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নেওয়ার আবেগপূর্ণ আহ্বান জানিয়েছিল তা হোমি ভাভার কাছে গুরুত্ব পায়নি। বরং তারা এডওয়ার্ড সাইদকে মধ্যপ্রাচ্যের প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন করে প্যালেস্টাইনের অধিকারের পক্ষে লড়াইকে বি-রাজনীতিকরণ করেছে। অনুরূপভাবে এডওয়ার্ড সাইদের সাহসী সংগ্রামী অবস্থান এবং বুদ্ধিভিত্তিক প্রতিনিধিত্বের জন্য তার আহ্বানও অধিকাংশ তত্ত্বকাররা আমলে নেননি। তাই ল্যাজারাসের মতে—পোস্ট-কলোনিয়ান সাহিত্য যতটা বিশ্বকে তুলে ধরতে পেরেছিল, পরবর্তীতে পোস্ট-কলোনিয়ানরা তত্ত্বকাররা ততটুকু করতেও ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন।
পোস্ট-কলোনিয়ান তত্ত্বকারদের মধ্য থেকে উঠে আসা আরও সমালোচনা হলো—পোস্ট কলোনিয়ান তত্ত্ব বস্তুগত জগৎ থেকে দূরে সরে গিয়ে নিজেদের আবিষ্কৃত অ-বস্তুগত জগতের দিকে ধাবিত হয়। তারা ‘বর্তমান’কে অবহেলা করে ‘অতীতে’ ডুব দেয়। উপনিবেশবাদের ঐতিহাসিক পরিণতির দিকে শুধু মনোযোগ করে কিন্তু উপনিবেশিক শোষণ-শাসন-নিপীড়ন থেকে মুক্ত স্বাধীন দেশগুলির বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা থেকে সরে যায়। আবার ‘রাজনীতির’ ওপর ‘সংস্কৃতি’কে স্থান দেবার অভিযোগও তাদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত হয়েছে। আর এভাবে তারা উপনিবেশবিরোধী আন্দোলন ও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নানা লড়াই ভিত্তিক রাজনীতির মডেল দ্বারা বিপ্লবী রাজনৈতিক সংগ্রামকে প্রতিস্থাপিত করতে চায়।
আবার সামাজিক লড়াই সংগ্রাম থেকে সম্পৃক্ত না হবার অভিযোগও এই তত্ত্বের প্রবক্তাদের নিজেদের ভেতর থেকে উত্থাপিত হয়েছে। কারণ তারা যতটা পাঠভিত্তিক সমলোচনাতে আগ্রহী, ততটাই বাস্তব দুনিয়ার সামাজিক ও রাজনৈতিক লড়াইয়ের প্রতি অনাগ্রহী। ফলে যাদের প্রতিনিধি বলে তারা দাবি করে—সেই আম জনতার প্রতি তারা বাস্তবে আদৌ দায়বদ্ধ নয়। বিল এসক্রোফট, গ্যারেথ গ্রিফিথস ও হেলেন টিফিন তাদের দ্য এম্পেয়ার রাইটস ব্যাক গ্রন্থে দেখিয়েছেন, যে মধ্যপ্রাচ্যের চিন্তক ফ্রান্জ ফ্যানন, এডওয়ার্ড সাইদ ও আলবার্ট মিম্মি পোস্ট কলোনিয়ান তত্ত্বকারদের অনুপ্রেরণার ভিত্তি। অথচ এই মধ্যপ্রাচ্য সম্বন্ধে পোস্ট-কলোনিয়ান তত্ত্বকাররা আশ্চর্যজনকভাবে নিশ্চুপ। তারা সারাবিশ্ব নিয়ে ভাবিত হলেও বর্তমান সময়ে সবচেয়ে সমস্যা সংকুল অঞ্চল মধ্যপ্রাচ্যের সমাজ-রাজনীতি-সাহিত্য ও সংস্কৃতিও তাদের কাছে অবহেলিত। প্যালেস্টাইনের ক্ষেত্রেও তাদের এই রহস্যজনক অবস্থান প্রযোজ্য।
ওয়াটসন ও ওয়াইল্ডার তাদের ‘পোস্ট-কলোনিয়ান কনটেম্পোরারি’ গ্রন্থে—ওরিয়েন্টালিস্ট বা প্রাচ্যবাদী অনুসন্ধানী পদ্ধতি বলে পাশ্চাত্য জ্ঞান তত্ত্বকে খারিজ করার প্রচেষ্টাকে সমালোচনা করেছেন। কারণ এক্ষেত্রে ইরানের ‘সবুজ বিপ্লব’ ও ‘আরব বসন্তে’র মতো ঘটনাকে ব্যাখ্যা করা হয়নি। ফলে তা পোস্ট-কলোনিয়ান তত্ত্বের দাবি অনুযায়ী পূর্ব-পশ্চিম—এভাবে বিভাজনের তাত্ত্বিক ভিত্তিকে নিজেরাই চ্যালেঞ্জ জানায়। কারণ এই তত্ত্ব মনে করে তৃতীয় বিশ্বে অ-পাশ্চাত্য দেশের জনগণ তাদের দীর্ঘকালের জমাট বাধা জাত-পাত, শ্রেণি, বর্ণ, ধর্ম, জাতিগত পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে বৃহত্তর স্বার্থে একটি সামগ্রিক সংহতি তুলে ধরতে পারে না। কিন্তু বাস্তবতা এর উল্টোটাই প্রমাণ করে।
বস্তুতঃ পোস্ট-কলোনিয়াল তত্ত্ব বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর থেকে আসায় তা সাম্রাজ্যবাদের চালিকা শক্তি সম্বন্ধে তত্ত্বগত আলোচনা চালাতে আগ্রহী নয়। এটা পরিচয় রাজনীতির বা আইডেনটিটি পলিটিকসের নৈতিকতাবাদী ও নিন্দামুখর সংস্কৃতির অংশে পরিণত হয়—যা আজ প্রাধান্যশীল বুদ্ধিবৃত্তিক ফ্যাশন। আর এ অবস্থায় কি বলা হল, তার চাইতে কে বললো—কৃষ্ণাঙ্গ, শ্বেতাঙ্গ, নারী, আদিবাসী, সমকামী নাকি অন্য কেউ—তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বামপন্থী রাজনৈতিক অবস্থান গ্রহণের চাইতে, সঠিক ভাষা ব্যবহার করা হলো কিনা—তা প্রাধান্য পায়। এখানে সত্য বা বস্তুগত বাস্তবতা বিষয় নয়—অন্তহীন ডিসকোর্স, অভিজ্ঞতা, মতামত গুরুত্বপূর্ণ। ঐক্যবদ্ধভাবে বিদ্যমান বাস্তবতা বদলের লড়াইয়ে সামিল হওয়া মানুষের দায়িত্ব-কর্তব্য নয়, শুধু নিজের মনকে বি-উপনিবেশিকায়ন বা ডি-কলোনাইজ করলেই চলবে।
এই উপমহাদেশের বিশ্বখ্যাত মার্কসবাদী বুদ্ধিজীবী আইজাজ আহমেদের মতে উপনিবেশ ও জাতি সংক্রান্ত এই পোস্ট-কলোনিয়াল তত্ত্ব—সাহিত্য, সাহিত্য তত্ত্ব এবং বিশ্বের মধ্যকার সম্পর্ককে আড়াল করে প্রকৃত ঘটনার সম্বন্ধে ভ্রান্ত জ্ঞান তুলে ধরে। উপরন্তু এই তত্ত্বকারদের জটিল ভাষা তৃতীয় বিশ্বের জনগণের উপর সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আধিপত্যের ক্ষেত্রে কোনো প্রাসঙ্গিকতা ধারণ করে না। সেই জন্য তিনি মনে করেন—পোস্ট-কলোনিয়াল বুদ্ধিজীবিরা হলেন ‘মেট্রোপলিটান ইউনিভার্সিটিতে অবস্থানকারী র্যাডিক্যালাইজড ইমিগ্রান্ট’ (Radicalized Immigrant)।
পোস্ট-কলোনিয়াল তত্ত্বের অন্যতম প্রবর্তক জে সি ইয়ং ঘোষণা করেন—এই তত্ত্বকে একটি ‘হস্তক্ষেপমূলক সম্ভবনার অবস্থান’ গ্রহণ করতে হবে। এক্ষেত্রে তাঁর দাবি—‘পোস্ট-কলোনিয়াল তত্ত্ব একটি সামঞ্জস্যপূর্ণ পদ্ধতির বদলে একটি রাজনীতিকে তুলে ধরে।’ কিন্তু এই রাজনৈতিক কি তা কখনও স্পষ্ট নয়। অন্যদিকে পোস্ট-কলোনিয়াল তত্ত্বের প্রবক্তরা মনে করেন—এই তত্ত্বে নানা রাজনৈতিক ধ্যান-ধারণার সমাহার ঘটেছে এবং বিভিন্ন তত্ত্বের নির্যাস এখানে যুক্ত হয়েছে—যা মার্কসবাদের ক্ষেত্রে হয়নি। কিন্তু বাস্তবে মার্কসবাদ এ যাবৎকালের অর্জিত মানব জ্ঞানের ভিত্তিতে বিকশিত হয়েছে। শুধু তফাৎ হলো—মার্কসবাদ সব সময়ই অন্তর্গত সংহতি ও পদ্ধতিমুখী। আর পোস্ট-কলোনিয়াল তত্ত্ব অসামঞ্জস্যপূর্ণ, বিক্ষিপ্ত—ফলে এর মধ্যকার বিভিন্ন ধারাকে বিচার-বিশ্লেষণ করে সমন্বিত করার বিপক্ষে।
আসলে কিছু ক্ষেত্রে প্রশংসার দাবিদার এই তত্ত্ব যদি সত্যিই নয়া বিপ্লবী ও বৈজ্ঞানিক অন্তর্দৃষ্টি দিতে পারতো এবং তার ভিত্তিতে সমাজ বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে অবদান রাখতো—তাহলে তা অনেক মূল্যবান ও গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠতো। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি।
এদিকে বিশ্ব শ্রমিক আন্দোলনে ভাটা ও সমাজতন্ত্রের সংকটের প্রেক্ষিতে বামপন্থার বিপর্যয়, অন্যদিকে এ অবস্থা থেকে উত্তরণের প্রকৃত বিপ্লবী তত্ত্ব চর্চার অনুপস্থিতিতে বুদ্ধিজীবিরা তাদের নৈতিক অঙ্গীকার থেকে একটি বিকল্প বিপ্লবী তত্ত্ব খুঁজতে থাকে। সেই সঙ্গে শ্রেণি শোষণ ও শ্রেণি সংগ্রামের অভিজ্ঞতাহীন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা নানা নিপীড়ন সংক্রান্ত বিষয়ে আগ্রহী হয়ে উঠে। ফলে নিপীড়ন সমীক্ষা বা অপ্রেশন স্টাডির (Oppression Study) একটি চাহিদা দেখা দেয়। পোস্ট-কলোনিয়াল তত্ত্ব এটাকেই তার রসদ হিসাবে বেছে নেয়। তাই বিপুল সম্ভবনা সত্ত্বেও বিপ্লবী তত্ত্ব হবার সম্ভবনা হারিয়ে ফেললো এই তত্ত্ব। নিপীড়ন বিরোধী (Anti-oppression) এমন তত্ত্বের রূপে এর আত্মপ্রকাশ ঘটলো, যা শ্রেণি ও শ্রেণি সংগ্রাম পরিত্যাগ করলো এবং তলা থেকে গড়ে ওঠা গণআন্দোলনের বদলে একাডেমিক জগতের গর্ভে জন্ম নিল। ‘শ্রেণি’ (Class) নয়—তারা মনোযোগী হল ‘অপর’ (The other) এবং তার বিরুদ্ধে নিপীড়ন ও তার সংস্কৃতির দিকে। আর এভাবেই শাসক শ্রেণির কাছে রাজনৈতিকভাবে নিরাপদ ও নিরীহ তত্ত্বরূপে পৃষ্ঠপোষকতালাভকারী এই তত্ত্ব একাডেমিক জগত থেকে সমাজে—বিশেষতঃ শিক্ষিত বুদ্ধিদীপ্ত মৌসুমী বিপ্লবী তরুণের কাছে সমাদর লাভ করেছে। যদিও এই নয়া তত্ত্ব ক্রমশঃ তার ন্যায্যতা হারিয়ে ফেলছে সাম্প্রতিককালে।
সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি:
In Theory-Classes, Nations, Literature- Aijay Ahmad, Verso, London.
Postcolonial Theory and The Specter of Capital- Vivek Chibber, Verso 2013, London, NY.
The Class Matrix : Social Theory After The Cultural Turn- Vivek Chibber, Harvard University Press, 2022.
The World in a Grain of Sand: Postcolonial Literature and Radical Universalism. Nivedita Majumder, Verso, 2021.
ঔপনিবেশিকতা প্রসঙ্গে—কার্ল মার্কস ফ্রেডরিক এঙ্গেলস—প্রগতি প্রকাশন, মস্কো।
Max at the Margins : A Pioneer of anti-colonialism-Chris Nineham. University of Chicago Press 2016.
Is Marxism Eurocentric – Lance Selfa – International Socialism Project.
No, Karl Marx was not Eurocentric- Kevin B. Anderson. Jacobin.
The Last Years of Karl Marx : An Intellectual Biography- Marcello Musto- Translated by Patrick Camiller- Stanford University Press, California.
Dominance without Hegemoû: History and Power Colonial India- Ranajit Guha, Harvard University Press.
Provincialiæing Europe : Postcolonial Thought and Historical Difference- Dipesh Chakrabarty, Princeton University, Press-2007.
MarxÕs Euro centrism- Kolja Lindner, Radical Philosophy Journal-U.K.
Postcolonial Theory in the 21st Century : Is the past the future or is the Future the past – Tarique Niayi, Choice Journal, Vol-58, USA.
Scientific Shortcoming of Postcolonial Theory- Maximilian Felsch- Sage Journal- 2023, New York.
Is Class Straggle ÔEurocentricÕ? Maxism Vs. Post colonialism. Hamid Aliæadeh- Podocast, International Maxist University, 2022.
Post colonialism and identity Politics- A Marxist Critique—Ciaran Mulholland- Internationalist Standpoint, 2025.



মন্তব্য